জুলাইয়ের চেতনা গবেষণা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে: জাবি উপাচার্য
সূত্রঃ সংগৃহীত
**জাবি প্রতিনিধি**
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও চেতনাকে গবেষণা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তিনি বলেন, কোনো জাতির মুক্তির জন্য সংঘটিত আন্দোলনের ইতিহাস টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু স্মৃতিচারণ নয়, গবেষণা ও সৃজনশীল চর্চার মাধ্যমে তা সংরক্ষণ করতে হবে।
বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ১১টায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) প্রকাশিত স্মরণিকা **‘জাগরণ’**-এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপাচার্য বলেন, “জাতির মুক্তির জন্য সংঘটিত কোনো আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানকে টিকিয়ে রাখতে শুধু প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতি যথেষ্ট নয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই ইতিহাস পৌঁছে দিতে হলে গ্রন্থ, কবিতা, গল্প, নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে তা সংরক্ষণ করতে হবে।”
তিনি বলেন, “আজ আমরা শহীদ আনাসের মায়ের মুখে তাঁর সন্তানের লেখা একটি চিঠির কথা শুনেছি। দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী দেশের মানুষের ওপর নির্যাতনের খবর দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেনি। সে মাকে লিখেছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শহীদ হওয়া গোপনে বেঁচে থাকার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানের। এই আত্মত্যাগের গল্পগুলো আমাদের সবার জানা উচিত।”
শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আনাস, আলিফ, সিয়াম, শ্রাবণ গাজী, সাফওয়ানসহ যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের সংগ্রাম এবং তাঁদের পরিবারের অনুভূতি যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, ততই নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে। এসব গল্প মানুষের বিবেককে নাড়া দেয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়।”
জাকসুর প্রকাশিত স্মরণিকার প্রশংসা করে উপাচার্য বলেন, “আজ হয়তো এই বইটি খুব বেশি মানুষ পড়বে না। কিন্তু ২০ বা ৩০ বছর পর, যখন আমরা অনেকেই পৃথিবীতে থাকব না, তখন এই গ্রন্থটি ইতিহাসের মূল্যবান দলিল হয়ে থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে কারা এই দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন।”
তিনি আরও বলেন, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হলে মানুষের হৃদয়ে সততা ধারণ করতে হবে। লোভ, লালসা ও ঘৃণাকে দূরে রাখতে হবে। ঘৃণার কারণেই সমাজে সংঘাত সৃষ্টি হয়। অথচ সমাজের উদ্দেশ্য হলো ভালোবাসা ও মানবিকতা নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করা।”
তরুণদের উদ্দেশে উপাচার্য বলেন, “আপনারা দানব হবেন না, দানবকে আসতেও দেবেন না। অর্থ-সম্পদ কিংবা ক্ষমতার মোহে মানবিকতা হারানো যাবে না। মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের বিবেকের কাছেই জবাবদিহি করে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে জীবন্ত রাখতে গবেষণা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “শুধু আবেগ দিয়ে নয়, জুলাইকে গবেষণা, সাহিত্য, সংগীত ও অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের গান আজও মানুষকে আবেগাপ্লুত করে, তেমনি জুলাইয়ের ইতিহাস নিয়েও এমন সৃষ্টি হওয়া উচিত, যা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করবে।”
তিনি আরও বলেন, “জাকসুর এই উদ্যোগ একটি শুভ সূচনা। এটি এখানেই থেমে থাকা উচিত নয়। প্রতি বছর আরও সমৃদ্ধভাবে এ ধরনের আয়োজন হওয়া প্রয়োজন, যাতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও চেতনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকে।”
বক্তব্যের শুরুতে সাম্প্রতিক ক্যাম্পাস পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন উপাচার্য। তিনি জানান, বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং ক্লাস শুরুর আগে ক্যাম্পাসে বিশেষ তল্লাশির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে প্রকাশিত স্মরণিকা **‘জাগরণ’**-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যবৃন্দ, কোষাধ্যক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তি, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
এমকে/বিএম২৪









