কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকট, সিএনজি স্টেশনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম
কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকট, সিএনজি স্টেশনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন

সূত্রঃ সংগৃহীত

শাকিল হোসেন, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি


গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত ১০ দিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক বাসাবাড়ির চুলা জ্বলছে না। অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ লাইন। কোথাও কোথাও কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির সারি তৈরি হয়েছে।


সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত অ্যাম্বুলেন্স চালকরা। গ্যাস না পেয়ে অনেক অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় স্টেশনে আটকে থাকছে। এতে সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল থেকে কালিয়াকৈর পৌরসভা, সফিপুর, চন্দ্রা ও মৌচাকসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।


কালিয়াকৈর উপজেলা বেসরকারি ক্লিনিক এলাকার একটি সিএনজি স্টেশন থেকে শুরু করে আশপাশের সড়কে অ্যাম্বুলেন্স ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা।


কালিয়াকৈর থেকে ঢাকায় রোগী নিয়ে যাওয়ার পথে একটি স্টেশনে চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর মাত্র ৩০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন অ্যাম্বুলেন্স চালক সেলিম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘রোগীর অবস্থা খারাপ। অক্সিজেন চলছে। কিন্তু ৩০ টাকার গ্যাস দিয়ে পাঁচ কিলোমিটারও যাওয়া যাবে না। রাস্তায় রোগী মারা গেলে দায় কে নেবে?’


স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব মৃত্যুর বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


এদিকে গ্যাসের সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কালিয়াকৈর বাজারের বাসিন্দা হাসিনা বেগম বলেন, ‘সকাল ৬টা থেকে চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করছি। ১০টার দিকে কিছুটা আগুন আসে, এরপর আবার বন্ধ হয়ে যায়। বাচ্চাদের স্কুলের টিফিন বানাতে পারিনি। বাধ্য হয়ে ২ হাজার ১০০ টাকায় এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।’


তার অভিযোগ, গ্যাস সংকটের সুযোগে এলপিজি ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আগে যে সিলিন্ডার ১ হাজার ৬০০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটি এখন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে তিনি জানান।


গ্যাসের অভাবে কালিয়াকৈর উপজেলার ২৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ১৫টি বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। চালু থাকা কয়েকটি স্টেশনেও সরবরাহ খুবই কম।


স্থানীয় একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের দুপুর ২টার দিকে মাত্র ৩০ থেকে ৭০ টাকার গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। এই পরিমাণ গ্যাসে কয়েক কিলোমিটারের বেশি যাওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন চালকরা।


সিএনজি অটোরিকশাচালক রফিক মিয়া বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দুপুর ২টায় ৭০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। এই গ্যাস দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পেটের ভাত জুটবে না। মালিকের জমা দেব কীভাবে? এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।’


গ্যাসের সংকটে সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদেরও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।


শিল্পাঞ্চলেও পড়েছে গ্যাস সংকটের প্রভাব। কালিয়াকৈরের কয়েকটি পোশাক ও বস্ত্র কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা করছেন তারা।


এ বিষয়ে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) কালিয়াকৈর জোনাল অফিসের ব্যবস্থাপক বলেন, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় তারা বর্তমানে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ গ্যাস পাচ্ছেন। এ কারণে আবাসিক ও যানবাহন খাতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।


তবে পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।


গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন কালিয়াকৈরের বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য, গ্যাসের অভাবে একদিকে রান্না ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে যানবাহন ও জরুরি চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করে জনদুর্ভোগ কমানোর দাবি তাদের।