তদারকির ঘাটতিতে বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি, স্লিপার বাস যেন নীরব মৃত্যুর বাহন!

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম
তদারকির ঘাটতিতে বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি, স্লিপার বাস যেন নীরব মৃত্যুর বাহন!

সূত্রঃ ৭ আগস্ট সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি যাত্রীবাহী বাসকে দ্রুতগতির স্লিপার কোচ ধাক্কা দিলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।

নিজস্ব প্রতিবেদক


রাতের দীর্ঘ যাত্রায় স্বস্তি, ঘুমানোর সুবিধা আর তুলনামূলক আরাম—এসব সুবিধার কথা বলে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্লিপার বাস। সাধারণ বাসের তুলনায় বেশি ভাড়া দিয়েও যাত্রীরা এসব বাসে উঠছেন নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের আশায়। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে আসছে ভিন্ন চিত্র। যাত্রীদের স্বস্তির এই বাহনই অনেক ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকিতে। বাংলাদেশমেইল২৪ এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ কিছু তথ্য।


আমাদের অনুসন্ধান বলছে, দেশের বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী স্লিপার বাসের বড় একটি অংশ সাধারণ বাসের অনুমোদন নিয়ে পরে স্থানীয় ওয়ার্কশপে পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়েছে। চেসিসের বহনক্ষমতা, কাঠামোগত ভারসাম্য, উচ্চতা ও নকশার সঙ্গে নতুন বডি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব বিষয় যথাযথভাবে পরীক্ষা না করেই অনেক বাস সড়কে নামানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।


সাধারণ বাসের অনুমোদন, পরে স্লিপারে রূপান্তর


স্লিপার বাস তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমেই আসে চেসিসের সক্ষমতার প্রশ্ন। একটি নির্দিষ্ট চেসিস কতটুকু ওজন বহন করতে পারবে, তার ওপর কী ধরনের কাঠামো বসানো যাবে এবং কতজন যাত্রী বহনের অনুমতি রয়েছে—এসব বিষয় প্রকৌশলগতভাবে নির্ধারিত হওয়ার কথা।


কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আমদানিকৃত চেসিস দেশে আসার পর স্থানীয় বিভিন্ন ওয়ার্কশপে সেগুলোর কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার বাস বানানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ বাসের অনুমোদন নিয়েই পরে সেটিকে একতলা বা দোতলা স্লিপার বাসে রূপ দেওয়া হয়।


এতে চেসিসের সঙ্গে বডির উচ্চতা, ওজন ও ভারসাম্যের সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, বাসের উচ্চতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এর কেন্দ্রীয় ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে দোতলা কাঠামো হলে বাঁক নেওয়া, দ্রুতগতিতে চলা কিংবা আকস্মিক ব্রেক করার সময় বাসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে নকশা ও প্রকৌশলগত সক্ষমতা যাচাই ছাড়া এ ধরনের পরিবর্তন যাত্রীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।


৩২ আসনের বাসে ৪৫টি স্লিপার!


স্লিপার বাসের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে অতিরিক্ত আসন সংযোজনের বিষয়টি।


আমাদের অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, একটি সাধারণ এসি বাসে যেখানে প্রায় ৩২টি আসন থাকে, সেখানে কিছু দোতলা স্লিপার বাসে ৪৫টি পর্যন্ত স্লিপিং সিট দেখা যায়। অর্থাৎ যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়াতে একই চেসিসের ওপর অতিরিক্ত কাঠামো ও আসন যুক্ত করা হচ্ছে।


এতে একদিকে যেমন গাড়ির মোট ওজন বাড়ছে, অন্যদিকে যাত্রী ও মালামালের ওজন মিলিয়ে চেসিসের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।


আরাম ও বেশি যাত্রী বহনের প্রতিযোগিতায় যদি গাড়ির প্রকৌশলগত নিরাপত্তা উপেক্ষিত হয়, তাহলে স্লিপার বাসের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।


ওসমানীনগরের দুর্ঘটনা বাড়িয়েছে উদ্বেগ


স্লিপার বাসের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর।


সম্প্রতি ওই এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বেঙ্গল পরিবহনের একটি স্লিপার বাস অন্য একটি পিকআপকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত লেনে চলে যায়। এ সময় সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।


মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনায় নয়জন নিহত এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে চলাচলকারী স্লিপার বাসগুলোর কাঠামো, অনুমোদন, চালকের দক্ষতা এবং যান্ত্রিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।


তবে কোনো একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাময়িক তৎপরতার বদলে সারা দেশে চলাচলকারী স্লিপার বাসের প্রকৌশলগত ও আইনগত বৈধতা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


আগুন লাগলে বের হওয়ার পথ কোথায়?


স্লিপার বাসে নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অগ্নিনিরাপত্তা। একটি আবদ্ধ বাসে আগুন লাগলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।


এ কারণে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি দরজা, বিকল্প নির্গমনপথ ও যাত্রীদের দ্রুত বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক স্লিপার বাসে এসব নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। কোথাও জরুরি নির্গমনপথ কার্যকর কি না, কোথাও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ব্যবহারযোগ্য কি না—এসব বিষয়ও নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।


রাতের যাত্রায় যাত্রীরা যখন ঘুমিয়ে থাকেন, তখন দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের মতো পরিস্থিতিতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ফলে স্লিপার বাসের নিরাপত্তা মান সাধারণ বাসের চেয়েও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।


চালকের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন


স্লিপার বাস চালানোর ক্ষেত্রে চালকের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দীর্ঘ রুটে রাতের বেলায় দ্রুতগতিতে চলাচলের সময় চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, দায়িত্ব পালনের সময়সীমা এবং বিকল্প চালকের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।


কিন্তু বাস্তবে এসব বিষয় কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।


একজন চালক দীর্ঘ সময় গাড়ি চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তার প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা কমে যেতে পারে। রাতের মহাসড়কে অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং চালকের ক্লান্তি একসঙ্গে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।


কার অনুমোদনে চলছে এসব বাস?


সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই—যে বাসের কাঠামো, আসনসংখ্যা কিংবা উচ্চতা মূল অনুমোদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেগুলো কীভাবে সড়কে চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে?


অভিযোগ রয়েছে, আমদানিকারক, বডি নির্মাণকারী ওয়ার্কশপ, পরিবহন মালিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একাংশের মধ্যে যোগসাজশের কারণে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে।


তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।


বিশেষ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উচিত প্রতিটি স্লিপার বাসের অনুমোদন নতুন করে যাচাই করা। চেসিসের মডেল, বডির নকশা, মোট ওজন, উচ্চতা, আসনসংখ্যা, ব্রেকিং সিস্টেম, টায়ার, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি নির্গমনব্যবস্থা—সবকিছু পরীক্ষা না করে কোনো বাসকে সড়কে চলাচলের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।


যাত্রী নিরাপত্তা নাকি ব্যবসায়িক মুনাফা?


স্লিপার বাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ আরাম। কিন্তু সেই আরামের বিনিময়ে যাত্রীরা যদি নিজেদের অজান্তেই বাড়তি ঝুঁকি কিনে নেন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।


একজন যাত্রী সাধারণ এসি বাসের তুলনায় বেশি ভাড়া দিচ্ছেন। বিনিময়ে তিনি প্রত্যাশা করছেন নিরাপদ আসন, পর্যাপ্ত জায়গা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বের হওয়ার ব্যবস্থা এবং দক্ষ চালক।


কিন্তু অতিরিক্ত আসন বসিয়ে যদি বেশি যাত্রী বহনের মাধ্যমে মুনাফা বাড়ানো হয় এবং একই সঙ্গে গাড়ির প্রকৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাহলে সেটি শুধু যাত্রীসেবার ঘাটতি নয়—জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।


এখনই প্রয়োজন সমন্বিত অভিযান


সড়কে স্লিপার বাসের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর ওপর নজরদারিও বাড়াতে হবে। শুধু কাগজপত্র যাচাই নয়, বাস্তবে বাসের কাঠামো অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করতে হবে।


প্রয়োজনে দেশের সব স্লিপার বাসের তালিকা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে কারিগরি পরীক্ষা করা যেতে পারে। যেসব বাস অনুমোদিত নকশার বাইরে পরিবর্তন করা হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব ওয়ার্কশপ অননুমোদিতভাবে বাসের কাঠামো পরিবর্তন করছে, তাদের কার্যক্রমও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।


পরিবহন মালিকদেরও বুঝতে হবে—একটি বাসে কয়েকটি অতিরিক্ত সিট বসিয়ে সামান্য বেশি আয় করার চেয়ে একজন যাত্রীর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান।


নীরব মৃত্যুর বাহন নয়, নিরাপদ যাত্রার মাধ্যম হোক


স্লিপার বাস দেশের দূরপাল্লার পরিবহনে একটি আধুনিক সংযোজন হতে পারে। কিন্তু আধুনিকতার নামে যদি নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করা হয়, তাহলে সেটিই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।


তাই স্লিপার বাস বন্ধ করা নয়; বরং নিরাপদ, প্রকৌশলসম্মত ও অনুমোদিত স্লিপার বাস নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।


বিআরটিএ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে সারা দেশে চলাচলকারী স্লিপার বাসের অনুমোদন, কাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করতে হবে।


কারণ যাত্রীরা স্লিপার বাসে ঘুমাতে ওঠেন—মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে নয়।


সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, স্লিপার বাস হবে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রার বাহন; কোনোভাবেই নীরব মৃত্যুর বাহন যেন না হয়।