৭ নভেম্বরের চেতনা হোক গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়: নোবিপ্রবি উপাচার্য
সংগৃহীত
মো: শফিউল আলম, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করে গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। তিনি বলেছেন, বিপ্লবের সার্থকতা ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে। জাতীয় সংহতির প্রকৃত সার্থকতা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত।
শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে নোবিপ্রবির বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভা শেষে স্বাধীনতার ঘোষক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের দিন। ওই সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তির ঘটনা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তৈরি হয়।
তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে বহুদলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চালু হয়। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে তাঁর নেওয়া উদ্যোগগুলো দেশের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রভাব ফেলে।
উপাচার্য আরও বলেন, ১৯ দফা কর্মসূচি, খাল খনন ও সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে তাঁর উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা পরবর্তী সময়ে সার্ক প্রতিষ্ঠার পথ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি পুনর্বহালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয় স্মৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ। তবে কোনো ঐতিহাসিক দিবসকে দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সবার অংশগ্রহণ ও মূল্যবোধের জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়তে কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, রপ্তানি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের প্রসার ঘটাতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, চিকিৎসা ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের সার্থকতা নতুন আইন বা নতুন কাঠামো তৈরিতে নয়, বরং সেই কাঠামোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করে তোলায়। রাষ্ট্র সবার, দেশ সবার, স্বাধীনতা সবার এবং উন্নয়নের সুফলও সবার। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা ও ঐক্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর কেবল অতীতের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক, আত্মনির্ভরশীল, সাম্যভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অসমাপ্ত অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ৭ নভেম্বরের পটভূমিতে যে নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি হলেন বীর উত্তম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ প্রথমবার এবং ২৭ মার্চ দ্বিতীয়বার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্ব তাঁকে ৭ নভেম্বরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর বাংলাদেশ স্বাধীন ভূখণ্ড পেলেও ব্যক্তি স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নানা সংকট ছিল। ১৯৭৫ সালে সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করা হয়। সে সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল।
উপ-উপাচার্য বলেন, পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানকে আটক ও গৃহবন্দি করা হলে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি মুক্ত হন। এর ধারাবাহিকতায় তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসেন এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হন। পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৯ সালে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন অধ্যায় সূচিত হয়।
সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন নোবিপ্রবির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ, আইকিউএসি পরিচালক অধ্যাপক ড. আসাদুন নবী, সেকশন অফিসার মো. জিয়াউর রহমান, শাখা কর্মকর্তা আবদুল কাদের রহমান, পরিবহন শাখার প্রধান সহকারী মিজানুর রহমান, বার্তাবাহক মোশারফ হোসেন, কৃষি বিভাগের শিক্ষার্থী ও নোবিপ্রবি ছাত্রনেতা জাহিদ হাসান, ফিমস বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা হাসিবুল হাসান হাসিব এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে সাখাওয়াত হোসেন সায়েম।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বিভাগের চেয়ারম্যান, হল প্রভোস্ট, দপ্তর ও শাখাপ্রধান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নোবিপ্রবির ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. শিবলুর রহমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার তামজিদ হোছাইন চৌধুরী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া পরিচালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মো. গিয়াস উদ্দীন ভূঁইয়া।
এর আগে দিবসের কর্মসূচির শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে মুক্তিযুদ্ধের বেদিতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
এমকে/বিএম২৪









