শিক্ষকতা ছেড়ে মানবপাচারে কোটি টাকার সাম্রাজ্য, ৪ ব্যাংক হিসাব জব্দ

প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম
শিক্ষকতা ছেড়ে মানবপাচারে কোটি টাকার সাম্রাজ্য, ৪ ব্যাংক হিসাব জব্দ

সূত্রঃ ফাইল ছবি

মাদারীপুর প্রতিনিধি


মাদারীপুরের এক মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক হিসেবে মাসে ২৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন খন্দকার হাবিবুর রহমান। তবে শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে মানবপাচার চক্রে জড়িয়ে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক তার চারটি ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছে।


অনুসন্ধানে জানা যায়, মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ গোপালপুর এলাকার বাসিন্দা খন্দকার হাবিবুর রহমান আগে ডাসার উপজেলার ধজি হামিদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে তিনি মানবপাচার চক্রে যুক্ত হন এবং ছয় মাস আগে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।


অভিযোগ রয়েছে, ইতালিতে বৈধভাবে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন জেলার যুবকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন তিনি। পরে তাদের অবৈধভাবে লিবিয়ায় পাঠিয়ে সেখানে মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আরও লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হলেও অন্তত ৬৫ যুবক গত প্রায় ১০ মাস ধরে লিবিয়ার বন্দিশালায় আটকা রয়েছেন।


ভুক্তভোগীদের স্বজনদের দাবি, প্রত্যেকের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকার বেশি নেওয়া হলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইতালি পাঠানো হয়নি। বরং লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে তাদের। ক্ষোভে একাধিক পরিবার অভিযুক্তের বাড়ি ঘেরাও করে বিচারের দাবি জানিয়েছে।


অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত দুই বছরে খন্দকার হাবিবুর রহমানের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। বিষয়টি নজরে এলে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকে থাকা তার চারটি হিসাব ফ্রিজ করে দেয়। পাশাপাশি মানবপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে সিআইডি।


ভুক্তভোগীদের মধ্যে ডাসারের হাবিবুল ঘরামী, রামনগরের সিফাত সরদার, বরিশালের গৌরনদীর সাগর হাওলাদার এবং কালকিনির ফয়সাল হোসেনসহ অন্তত ৬৫ জন বর্তমানে লিবিয়ায় আটক রয়েছেন বলে তাদের পরিবারের দাবি। স্বজনরা জানান, মুক্তিপণের টাকা দিয়েও তারা এখনো প্রিয়জনদের ফেরত পাননি।


হাবিবুলের নানী রোকেয়া বেগম বলেন, বহুবার অভিযুক্তের বাড়িতে গিয়েও কোনো সুরাহা পাননি। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।


সিফাতের বড় ভাই রিফাত সরদার অভিযোগ করেন, ইতালিতে পাঠানোর নামে তার ভাইকে লিবিয়ায় আটকে রাখা হয়েছে। টাকা ফেরতও দেওয়া হচ্ছে না।


সাগরের মা সাহানাজ বেগম বলেন, ২২ দিনের মধ্যে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও তার ছেলে এখন লিবিয়ায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। পর্যাপ্ত খাবারও পাচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।


ফয়সাল হোসেনের মা পারুল বেগম বলেন, নির্ধারিত টাকার চেয়েও বেশি অর্থ নেওয়া হলেও তার ছেলে এখনো বন্দি অবস্থায় রয়েছে।


ধজি হামিদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মো. আমিনুল ইসলাম জানান, ছয় মাস আগে হাবিবুর রহমান ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। পরে তারা জানতে পারেন, শিক্ষকতার আড়ালে তিনি মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।


কৃষি ব্যাংকের গোপালপুর হাট শাখার ব্যবস্থাপক কে এম আতাহার হোসেন বলেন, অস্বাভাবিক লেনদেনের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে তার হিসাব স্থগিত করা হয়েছে।


গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ভুরঘাটা উপশাখার ইনচার্জ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মানবপাচারের আশঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ওই হিসাবের সব ধরনের লেনদেন বন্ধ রয়েছে।


অভিযোগের বিষয়ে খন্দকার হাবিবুর রহমান দাবি করেন, ব্যাংক হিসাব স্থগিত হওয়ায় কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে তিনি কারও টাকা আত্মসাৎ করেননি এবং লিবিয়ায় আটক যুবকদের দ্রুত ইতালি পাঠানোর চেষ্টা চলছে।


মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ সাব্বির হোসেন বলেন, ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্তের বাড়ি ঘেরাও করার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



এমকে/বিএম২৪