গ্যাস-কাঁচামাল সংকটে থমকে সার উৎপাদন, আমন নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা
সূত্রঃ সংগৃহীত
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের চারটি সার কারখানার মধ্যে তিনটিতেই উৎপাদন স্বাভাবিক না থাকায় আসন্ন আমন মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গ্যাস সংকটে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল)-এ। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ সীমিত থাকায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে কৃষকদের মধ্যে আমন মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে চট্টগ্রামে চারটি সার কারখানা পরিচালিত হয়। এর মধ্যে সিইউএফএল ও কাফকো ইউরিয়া, ডিএপিএফসিএল ডিএপি এবং টিএসপি কমপ্লেক্স টিএসপি সার উৎপাদন করে।
আনোয়ারায় অবস্থিত সিইউএফএল গত ৪ মার্চ থেকে গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে। এর আগেও অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কারখানাটির উৎপাদন বারবার ব্যাহত হয়েছে।
কারখানার প্রধান রসায়নবিদ উত্তম চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত সিইউএফএলে প্রায় ৬৫ হাজার টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ উৎপাদন ছিল প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টন। নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে চলতি অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন ইউরিয়া উৎপাদন সম্ভব হতো বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএপি সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডিএপিএফসিএলে কাঁচামাল ফসফরিক অ্যাসিডের সংকটে টানা এক মাসের বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। গত ২৮ জুন সকাল থেকে কারখানাটির উৎপাদন পুরোপুরি স্থগিত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০ হাজার টন ফসফরিক অ্যাসিড আমদানির জন্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাঁচামাল দেশে পৌঁছায়নি।
ডিএপিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মঈনুল হক বলেন, ফসফরিক অ্যাসিডের ঘাটতির কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, কর্ণফুলী উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত কাফকোতেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭২৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতার এই কারখানায় বর্তমানে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে গ্যাস ব্যবহার করে উৎপাদন চালানো হচ্ছে।
কাফকোর চিফ পার্সোনেল আবদুল্লাহ ফারুক জানান, কারখানার উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও গ্যাস ব্যবহারে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, উপকূলীয় চট্টগ্রামে লবণাক্ততার কারণে বোরো চাষ কমে যাওয়ায় কৃষকদের বড় অংশ এখন আমন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ইউরিয়ার চাহিদা ৪৭ হাজার ৩৬৬ মেট্রিক টন, টিএসপি ২৪ হাজার ৬২৭ মেট্রিক টন, ডিএপি ২৫ হাজার ৫৪২ মেট্রিক টন এবং এমওপি ১২ হাজার ৮৪৩ মেট্রিক টন।
তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের আশঙ্কা, বর্তমানে গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও উৎপাদনকারী কারখানাগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে আমন মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের সরবরাহ ব্যাহত হলে সময়মতো সার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, যা ধানের উৎপাদন ও কৃষকের ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আনোয়ারা ও বোয়ালখালীর একাধিক কৃষক দ্রুত বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার পাশাপাশি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সারের মজুত ও বিতরণব্যবস্থার কঠোর তদারকির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, শিল্প খাতে চলমান গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
তবে সার সংকটের আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক আছে। কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা নির্ধারিত দামের বেশি দামে সার বিক্রির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই বক্তব্য দিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক আপ্রু মারমা। তিনি বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রামে যে পরিমাণ রাসায়নিক সার মজুত রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত তিন মাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব
এমকে/বিএম২৪








