ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম
ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনা

সূত্রঃ ফাইল ছবি

 ড. মনিরুল ইসলাম


বাংলাদেশে বিদ্যুতের বাড়তে থাকা চাহিদা, আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চ ব্যয় এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট মোকাবিলায় দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উঠে এসেছে ফ্লাইহুইলভিত্তিক গ্রিন পাওয়ার ব্যবস্থা। পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), বগুড়ার গবেষক দল এ প্রযুক্তির একটি কার্যকর প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন গবেষণা দলের সদস্য ড. মনিরুল ইসলাম।


গবেষক দলের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ভাবিত ব্যবস্থায় মোটর, ভেরিয়েবল ফ্রিকোয়েন্সি ড্রাইভ (ভিএফডি), গিয়ারবক্স, ভারী ফ্লাইহুইল, শ্যাফট, বিয়ারিং এবং ১৫০ আরপিএমের স্থায়ী চুম্বক জেনারেটর ব্যবহার করা হয়েছে। মোটরের মাধ্যমে ফ্লাইহুইলে ঘূর্ণনশক্তি সঞ্চিত হয়, যা প্রয়োজনের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়ে আকস্মিক লোড, ভোল্টেজ ও কম্পাঙ্কের ওঠানামা এবং স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎঘাটতি সামাল দিতে সক্ষম।


পরীক্ষামূলক প্রদর্শনীতে ৫০০ ওয়াট ইনপুটের মাধ্যমে সঞ্চিত ঘূর্ণনশক্তি ব্যবহার করে স্বল্প সময়ের জন্য প্রায় ৩ হাজার ওয়াট আউটপুট প্রদর্শন এবং একটি সাবমার্সিবল পাম্প চালানোর সক্ষমতা দেখানো হয়েছে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ পাইলট প্রকল্পে ইনপুট-আউটপুট, কর্মদক্ষতা, তাপমাত্রা, কম্পন, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব স্বাধীনভাবে যাচাই করা হবে।


বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও পেনসিলভানিয়ায় ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্লাইহুইল কেন্দ্র গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া চীনের শানসি প্রদেশে ৩০ মেগাওয়াটের ডিংলুন ফ্লাইহুইল প্রকল্প এবং আয়ারল্যান্ডের মানিপয়েন্টে বৃহৎ ফ্লাইহুইলভিত্তিক সিনক্রোনাস কনডেনসার নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎসমৃদ্ধ গ্রিডে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাজ করছে।


গবেষক দলের প্রাথমিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, এক মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্লাইহুইল গ্রিন পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা ব্যয় ধরা হয়েছে ১ টাকা, সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল ৪০ বছর এবং প্রকল্পজীবনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তুলনামূলকভাবে একই ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ১১০ কোটি টাকা ব্যয়, ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা উৎপাদন খরচ এবং ২৫ বছরের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে। একইভাবে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায়ও ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিকে অনেক বেশি সাশ্রয়ী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি নতুন শক্তি উৎপাদন করে না; এটি মূলত শক্তি সঞ্চয়, দ্রুত সরবরাহ এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাজ করে। তাই সৌরবিদ্যুতের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক প্রযুক্তি হিসেবে একে বিবেচনা করা উচিত।


গবেষণা দলের মতে, সৌরবিদ্যুতের উদ্বৃত্ত শক্তি ফ্লাইহুইলে সংরক্ষণ করে সন্ধ্যার বিদ্যুৎ চাহিদা, সেচপাম্প, হিমাগার, হাসপাতাল, পোশাকশিল্প, ইপিজেড ও অন্যান্য শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা গেলে ডিজেল জেনারেটরের ব্যবহার কমবে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং কাঁচামালের অপচয় হ্রাস পেয়ে দেশের উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।


তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, এসব তথ্য এখনো প্রাথমিক প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক মূল্যায়নের অংশ। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পূর্ণাঙ্গ পাইলট পরীক্ষা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের যাচাই এবং দেশীয়ভাবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা গেলে ফ্লাইহুইলভিত্তিক গ্রিন পাওয়ার প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।


এমকে/বিএম২৪