মেঘের চাদরে অধরা কাঞ্চনজঙ্ঘা, তেঁতুলিয়ায় পর্যটকের ঢল

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম
মেঘের চাদরে অধরা কাঞ্চনজঙ্ঘা, তেঁতুলিয়ায় পর্যটকের ঢল

সংগৃহীত

সাইয়্যেদ মুহাম্মদ শান্ত, পঞ্চগড় প্রতিনিধি


উত্তরের আকাশজুড়ে হিমেল হাওয়া, ধোঁয়াটে কুয়াশা আর ঘন মেঘের আস্তরণ। ভোরের আলো ফোটার আগেই তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন হাজারো পর্যটক। সবার চোখ উত্তরের দিগন্তে—উদ্দেশ্য হিমালয়ের তুষারশুভ্র পর্বতচূড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার একঝলক দেখা। তবে সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও মেঘের আড়াল ভেদ করে দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেই পর্বতশৃঙ্গের।


শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটিকে কেন্দ্র করে হিমালয়কন্যাখ্যাত পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ভ্রমণপিপাসুদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। তবে টানা এক সপ্তাহ ধরে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে না পেরে কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই ফিরতে হচ্ছে অনেক পর্যটককে। তবুও সেই আক্ষেপ ভুলে তাঁরা মুগ্ধ হচ্ছেন সমতলের সবুজ চা-বাগান, সীমান্তবর্তী মহানন্দা নদী এবং উত্তরের শান্ত প্রকৃতির সৌন্দর্যে।


রাত থেকেই ডাকবাংলোয় পর্যটকদের অপেক্ষা


বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল থেকে তেঁতুলিয়ার প্রধান পর্যটনকেন্দ্র ডাকবাংলো পিকনিক কর্নারে পর্যটকদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। পরিবার, প্রিয়জন ও বন্ধুদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন দর্শনার্থীরা। ফজরের আজানের পর থেকেই, এমনকি গভীর রাতেও অনেকে ডাকবাংলোর সীমানাপ্রাচীরের পাশে অবস্থান নেন। কারও হাতে ক্যামেরা, কেউ মুঠোফোন প্রস্তুত রেখেছেন—যদি উত্তরের আকাশ থেকে একটুখানি মেঘ সরে যায়, আর দেখা মেলে কাঙ্ক্ষিত কাঞ্চনজঙ্ঘার।


রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক দম্পতি আলমাস ও রেবেকা বলেন, “ছুটিতে মূলত কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতেই পঞ্চগড়ে আসা। মেঘের কারণে চূড়া দেখা না গেলেও তেঁতুলিয়ার শান্ত পরিবেশ, রাতের ডাকবাংলোর আবহ আর মহানন্দার রূপ আমাদের দারুণ লেগেছে।”


প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলো, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, শালবাহান ও সরদারপাড়া এলাকা থেকে খালি চোখেই কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়। চলতি মৌসুমের শুরুতে কয়েক দিন পর্বতটির দেখা মিললেও গত এক সপ্তাহ ধরে তা মেঘের আড়ালে রয়েছে।


কাঞ্চনজঙ্ঘা না দেখে ঘুরছেন বিকল্প দর্শনীয় স্থানে


কাঙ্ক্ষিত পর্বতচূড়া দেখতে না পেয়ে পর্যটকেরা ঘুরে দেখছেন তেঁতুলিয়া ও আশপাশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট ও রকস মিউজিয়াম, বিস্তীর্ণ সবুজ চা-বাগান, মহানন্দা নদী, মহারাজার দিঘি, আনন্দধারা ও বড়বিল্লাহ। এ ছাড়া সীমান্তঘেঁষা ঐতিহ্যবাহী দর্জিপাড়া, কাজীপাড়া ও শারিয়ালজোত গ্রামেও ঘুরছেন অনেকে।


পর্যটকের ঢলে চাঙা স্থানীয় অর্থনীতি


কাঞ্চনজঙ্ঘা অধরা থাকলেও পর্যটকদের আগমনে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে তেঁতুলিয়ার স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে। রিসোর্ট, হোটেল ও হোমস্টেগুলোতে কক্ষের চাহিদা বেড়েছে। চায়ের দোকান, খাবারের হোটেল ও স্থানীয় পরিবহনেও বেড়েছে ব্যস্ততা। পর্যটকদের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যেতে অটোরিকশা ও ভ্যানচালকদের ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যাচ্ছে।


নভেম্বরের শুরুতে দেখা মিলতে পারে কাঞ্চনজঙ্ঘার


কাঞ্চনজঙ্ঘা আবার কবে দৃশ্যমান হতে পারে, এমন প্রশ্নে তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় জানান, বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে মেঘ ও কুয়াশার উপস্থিতির কারণে পর্বতচূড়াটি দেখা যাচ্ছে না। অক্টোবরের বাকি দিনগুলোতেও এমন আবহাওয়া থাকতে পারে।


তবে নভেম্বরের শুরুতে আকাশ পুরোপুরি মেঘমুক্ত ও পরিষ্কার হলে আবারও টানা বেশ কয়েক দিন কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।


পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রশাসনের নজরদারি


পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে তৎপর রয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসাইন জানান, পর্যটন মৌসুমে বহিরাগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও হয়রানি এড়াতে রিসোর্ট ও পর্যটন এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।


আবহাওয়ার কারণে আপাতত স্বপ্নের পর্বতচূড়া অধরা থাকলেও পর্যটকদের প্রত্যাশা, খুব শিগগিরই মেঘের পর্দা সরিয়ে ভোরের সোনালি রোদে উদ্ভাসিত হবে রূপসী কাঞ্চনজঙ্ঘা।


এমকে/বিএম২৪