নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়েই উপেক্ষিত নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট, ১২ বছরেও নেই স্থায়ী পরিচালক

প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়েই উপেক্ষিত নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট, ১২ বছরেও নেই স্থায়ী পরিচালক

সংগৃহীত

সৌরভ আহমেদ সাগর,নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি


জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত দেশের একমাত্র নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট চলছে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন নিয়ে গবেষণা এবং তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিতে ১২ বছরেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি স্থায়ী পরিচালক। ২৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। নেতৃত্বের অভাব ও জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে গবেষণা, প্রকাশনা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম।


প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও যে প্রতিষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল নজরুল গবেষণার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কেন্দ্র, সেটিই এখন নিজস্ব সক্ষমতা ও প্রত্যাশা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে।


২০১৪ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’। কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা, তাঁর রচনাবলি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, প্রকাশনা এবং দেশে-বিদেশে তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও আদর্শ তুলে ধরার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশে এটিই প্রথম ও একমাত্র নজরুল গবেষণাবিষয়ক ইনস্টিটিউট। তবে প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পার হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো প্রত্যাশিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।


স্থায়ী পরিচালক নেই, নেতৃত্বে উপাচার্য


প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন এলেও ইনস্টিটিউটটির জন্য স্থায়ী পরিচালক নিয়োগের উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি ইনস্টিটিউটের গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন। ফলে পূর্ণকালীন ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাব প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. হাবিব-উল-মাওলা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদটি সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ার সঙ্গে যুক্ত, যা অন্য ইনস্টিটিউটের পরিচালকদের ক্ষেত্রে নেই। দীর্ঘদিনেও এ পদে স্থায়ী নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ার পেছনে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা বা কৌশলগত কোনো বিষয় কাজ করছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।’


তিনি আরও বলেন, ‘নজরুল সাহিত্য নিয়ে কাজ করা যোগ্য সাহিত্যিক ও গবেষকদের মধ্য থেকেও পরিচালক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব। তবে শুধু পরিচালক নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিষ্ঠানটিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।’


২৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র তিনজন


ইনস্টিটিউটটির কার্যক্রমে অন্যতম বড় বাধা জনবল সংকট। ২৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। ফলে গবেষণায় সহায়তা, প্রশাসনিক কাজ, প্রকাশনা এবং তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সীমিত জনবল দিয়ে সামলাতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নজরুলের জীবন ও কর্ম নিয়ে পরিকল্পিত, বৈচিত্র্যময় এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।


ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজের অতিরিক্ত পরিচালক রাশেদুল আনাম বলেন, স্থায়ী পরিচালক না থাকা এবং অনুমোদিত পদের তুলনায় কমসংখ্যক জনবল থাকার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলতে পারবে। সীমিত জনবল নিয়েই ইনস্টিটিউটের নিয়মিত গবেষণা, প্রকাশনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।


গবেষণার সম্ভাবনা থাকলেও কার্যক্রম সীমিত


বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে ‘নজরুল স্টাডিজ’ বাধ্যতামূলক কোর্স হিসেবে পড়ানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নজরুলের সাহিত্য, দর্শন ও আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি উচ্চতর গবেষণার ক্ষেত্র তৈরিতেও ইনস্টিটিউটটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত গবেষক, প্রয়োজনীয় জনবল ও স্থায়ী নেতৃত্বের অভাবে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।


তবে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে। গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও গ্রন্থ প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের মতো উদ্যোগ রয়েছে এর কার্যক্রমে। ভারতের নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ‘নজরুল জার্নাল’ প্রকাশও প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম অর্জন। তবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও সম্ভাবনার তুলনায় এসব কার্যক্রম এখনো সীমিত।


অধ্যাপক ড. মো. হাবিব-উল-মাওলা বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পর্যাপ্ত জায়গা ও অবকাঠামোর অভাবকে কার্যক্রম পরিচালনার বড় বাধা হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে শুধু জায়গা বা ভবন সংকটকে মূল সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলে প্রকৃত সংকট আড়ালে থেকে যাবে। অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে নজরুলকে যথাযথভাবে ধারণ করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাঁর দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে।


নতুন ভবনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা


ইনস্টিটিউটটির অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবনটির একাংশে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। সেখানে এই ইনস্টিটিউট ছাড়াও আরও চারটি ইনস্টিটিউট স্থানান্তর করা হবে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। নতুন ভবন প্রস্তুত হলে ইনস্টিটিউটটি সেখানে স্থানান্তর করা হবে। পাশাপাশি নজরুল গবেষণায় অভিজ্ঞ কোনো গবেষক বা বিশেষজ্ঞকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।


সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ভবন ইনস্টিটিউটটির অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কিছুটা কমাতে পারে। তবে শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে গবেষণার কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন স্থায়ী পরিচালক নিয়োগ, অনুমোদিত পদে জনবল নিয়োগ, গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং দীর্ঘমেয়াদি অ্যাকাডেমিক পরিকল্পনা।


এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হলে জাতীয় কবির জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের একমাত্র নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না।


এমকে/বিএম২৪