ইউজিসির আপত্তি, বাজেটেও বরাদ্দ নেই; তবুও বেতন পাচ্ছেন জাবিপ্রবির ৫ শিক্ষক

প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম
ইউজিসির আপত্তি, বাজেটেও বরাদ্দ নেই; তবুও বেতন পাচ্ছেন জাবিপ্রবির ৫ শিক্ষক

সংগৃহীত

মো: ইকরাম মাহমুদ প্রধান, জাবিপ্রবি প্রতিনিধি


নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিপ্রবি) পাঁচ শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অডিট আপত্তিতে এসব নিয়োগে নির্ধারিত বয়সসীমা লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতার জন্য বাজেটে কোনো বরাদ্দ রাখেনি কমিশন। তবে ইউজিসির আপত্তি সত্ত্বেও তাঁদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক সুপারিশ ও প্রভাব খাটিয়ে এসব বিতর্কিত নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।


ইউজিসির বাজেট অ্যাসেসমেন্ট দল গত ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেট যাচাই করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মোট ২৬টি পর্যবেক্ষণ উত্থাপন করা হয়। এর প্রথমটিতেই উঠে আসে পাঁচ শিক্ষকের নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়টি।


ইউজিসির অডিট আপত্তিতে বলা হয়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রভাষক পদের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৩০ বছর এবং সহকারী অধ্যাপক পদের জন্য ৩৫ বছর। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ব্যক্তিগত নথি যাচাই করে দেখা যায়, আবেদনের শেষ তারিখে পাঁচজনেরই বয়স নির্ধারিত সীমার বেশি ছিল।


তাঁরা হলেন—সমাজকর্ম বিভাগের ড. এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান (৪৫ বছর ৮ মাস), কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের ড. মো. মাহমুদুল আলম (৪০ বছর ১ মাস), গণিত বিভাগের ড. মুহাম্মদ শাহ জালাল (৪২ বছর ১০ মাস), হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ড. সৈয়দ নাজমুল হুদা (৩৮ বছর ৯ মাস) এবং সমাজকর্ম বিভাগের ড. আল মামুন সরকার (৩৯ বছর ৫ মাস)। তাঁদের মধ্যে প্রথম তিনজন সহকারী অধ্যাপক এবং শেষ দুজন প্রভাষক পদে নিয়োগ পান।


নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান ও আইনের আলোকে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। নিয়োগগুলো নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পাঁচ শিক্ষকের বেতন-ভাতা বাবদ কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।


এ ছাড়া ইউজিসি জানায়, এসব পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তির জন্য একাধিকবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে কয়েকটি খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি। পর্যবেক্ষণগুলো নিষ্পত্তি না হলে চাহিদা ও বরাদ্দের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে কমিশন।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইউজিসির একই ধরনের অডিট আপত্তির পর দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন বন্ধ ও চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে জাবিপ্রবিতে এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত পাঁচ শিক্ষকের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বাজেটে তাঁদের বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত বেতন দেওয়া হচ্ছে।


বিষয়টি জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. সারোয়ার জাহান বলেন, ইউজিসির চিঠি তাঁরা পেয়েছেন এবং এর জবাব দেওয়া হবে। চিঠি ইস্যুর চার মাসের বেশি সময় পার হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না কিংবা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। ইউজিসি আরও কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে তখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


ওই পাঁচ শিক্ষক নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন কি না জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার বলেন, তাঁরা বেতন পাচ্ছেন। তবে কোন খাত থেকে বেতন দেওয়া হচ্ছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব ও অর্থ বিভাগ বলতে পারবে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব ও অর্থ বিভাগের উপপরিচালক আবদুল জলিল মিয়া বলেন, এসব শিক্ষকের বেতন নিয়মিত বেতন-ভাতা খাত থেকেই দেওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত নির্দেশনা না এলে তাঁরা বেতন দিয়ে যাবেন। বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলে ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করবে।


এদিকে ইউজিসির পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দেও প্রভাব পড়ছে। এসব আপত্তি নিষ্পত্তি না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা ও বরাদ্দের ব্যবধান আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেছে কমিশন।


এ বিষয়ে সিএসই বিভাগের ড. মো. মাহমুদুল আলমের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।


অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছিল। নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে।


ড. এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে তিনি ‘মুজিব শতবর্ষের ইতিহাস’ গ্রন্থ রচনা করেন। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বিভিন্ন কলামে ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা এবং তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে কটূক্তিমূলক লেখা প্রকাশের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।


অন্যদিকে, ড. সৈয়দ নাজমুল হুদা ও ড. মাহমুদুল আলম দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ‘রোড টু স্মার্ট বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতে নৌকার পক্ষে তৃণমূল পর্যায়ে ভোট প্রার্থনার ক্যাম্পেইনার ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


ড. মো. আল মামুন সরকার ‘উন্নয়নের রোল মডেল শেখ হাসিনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং টেলিভিশনের টকশোতে শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে নিয়ে আলোচক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।


এমকে/বিএম২৪