কৈশোরের প্রেম, আবেগ ও নৈতিক বিকাশ: যতটুকু সচেতনতা

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
কৈশোরের প্রেম, আবেগ ও নৈতিক বিকাশ: যতটুকু সচেতনতা

সূত্রঃ সংগৃহীত



মানুষের জীবনে প্রেম কোনো নির্দিষ্ট বয়সের দরজায় কড়া নেড়ে প্রবেশ করে না। কারও জীবনে কৈশোরে, কারও জীবনে তারও আগে কোনো বিশেষ মানুষের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়; আবার কেউ যৌবনের অনেক পরে গিয়ে গভীর আবেগের অর্থ বুঝতে শেখে। তাই একটি নির্দিষ্ট বয়সকে চিহ্নিত করে বলা-  “এই বয়সে প্রেম আসা স্বাভাবিক, আর ওই বয়সে অস্বাভাবিক” মানবমনের জটিলতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলা।


বিশেষ করে কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন শিশু ধীরে ধীরে শৈশব থেকে বেরিয়ে নিজস্ব পরিচয়, আত্মসম্মান, সম্পর্ক, শরীর, আবেগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখে। শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মস্তিষ্ক ও আবেগের বিকাশও চলতে থাকে। এই সময় কারও প্রতি ভালো লাগা, আকর্ষণ, মুগ্ধতা কিংবা বিশেষ আন্তরিকতা তৈরি হওয়া তাই মানুষের স্বাভাবিক বিকাশেরই একটি অংশ হতে পারে।


কিন্তু আমাদের সমাজে বিষয়টি নিয়ে একটি অদ্ভুত দ্বৈততা রয়েছে।


আমাদের ছোট ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগিনা-ভাগিনী কিংবা পরিবারের কোনো কিশোর-কিশোরীর কারও প্রতি ভালো লাগার কথা জানতে পারলে আমরা অনেক সময় অবাক হই, হাসাহাসি করি, নাক সিটকাই কিংবা কঠোর ভাষায় বিচার করি। অথচ আমরাও একসময় সেই বয়স পেরিয়ে এসেছি। আমাদের সময় ছিল চিঠির যুগ; কারও সময় ছিল ল্যান্ডফোন, কারও মোবাইল ফোন; আর আজকের প্রজন্ম বেড়ে উঠছে মেসেজ, ভিডিও কল, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, লাইভ স্ট্রিমিং এবং অসংখ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে।


মাধ্যম বদলেছে, মানুষের অনুভূতি বদলায়নি।


একসময় একটি চিঠি লিখে কারও হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যেই প্রেমের উত্তেজনা, অপেক্ষা এবং গোপনীয়তা ছিল। একটি চিঠির উত্তর পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। সেই অপেক্ষার মধ্যে কল্পনা ছিল, উদ্বেগ ছিল, আনন্দ ছিল।


আজ একটি মেসেজ কয়েক সেকেন্ডেই পৌঁছে যায়। একটি ছবি, একটি স্ট্যাটাস, একটি কমেন্ট কিংবা একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের সামনে চলে যেতে পারে।


অর্থাৎ যোগাযোগের গতি বেড়েছে; আবেগের প্রকাশও হয়েছে প্রকাশ্যতর।


এখানেই আমাদের নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পুরোনো প্রজন্মের বড় পার্থক্য। আজকের কিশোর-কিশোরীরা এমন একটি পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি খুব সহজেই ডিজিটাল প্রকাশে পরিণত হয়। ফলে তাদের আচরণকে শুধু পুরোনো সামাজিক মানদণ্ড দিয়ে বিচার করলে বাস্তবতাকে বোঝা কঠিন হবে।


তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের প্রকাশ গ্রহণযোগ্য। ব্যক্তিগত অনুভূতি স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু সেই অনুভূতি কীভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে- সেটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই প্রয়োজন শিক্ষা, সংযম ও নৈতিকতার।


একটি ছেলে ও একটি মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা কিংবা একে অপরের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া মানুষের সামাজিক ও জৈবিক বাস্তবতার অংশ।


কিশোর বয়সে মানুষ নিজের পরিচয় আবিষ্কার করতে থাকে। সে বুঝতে শেখে কে তাকে ভালোভাবে বোঝে, কার সঙ্গে কথা বলতে স্বস্তি লাগে, কার উপস্থিতিতে আনন্দ হয় এবং কার মতামত তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


এই অনুভূতিগুলোকে শুধুমাত্র “খারাপ” বলে দাগিয়ে দিলে কিশোর-কিশোরী তার আবেগ সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর ধারণা পাওয়ার সুযোগ হারাতে পারে।


বরং তাকে বোঝাতে হবে- ভালো লাগা আর দায়িত্বশীল সম্পর্ক এক জিনিস নয়। আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু সেই আকর্ষণকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কীভাবে অপর ব্যক্তির সম্মান ও ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষা করতে হবে, কীভাবে পড়াশোনা, পরিবার, ভবিষ্যৎ ও নিজের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে- এসব শেখাটাই বড় বিষয়।


আমরা অনেক সময় সন্তানকে নৈতিকতার শিক্ষা দিতে গিয়ে প্রথমেই ভয় দেখাই।


“এসব করলে জীবন শেষ।”


“প্রেম করলে পড়াশোনা নষ্ট।”


“ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্ব মানেই সমস্যা।”


“এ বয়সে এসব চিন্তা করা অপরাধ।”


এই ধরনের কথায় সাময়িকভাবে হয়তো কোনো শিশু চুপ হয়ে যায়। কিন্তু তার প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয় না।


ফলে সে উত্তর খুঁজতে শুরু করে বন্ধুদের কাছে, ইন্টারনেটে কিংবা গোপন কোনো প্ল্যাটফর্মে। সেখানে সে সঠিক তথ্য যেমন পেতে পারে, তেমনি ভুল তথ্য, প্রতারণা, যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং কিংবা ক্ষতিকর সম্পর্কের শিকারও হতে পারে।


তাই নৈতিকতার শিক্ষা মানে শুধু “না” বলা নয়। নৈতিকতার শিক্ষা হলো কেন কোনো আচরণ সঠিক বা ভুল, সেটি বোঝানো।


কৈশোরে কিশোর-কিশোরীদের বয়সোপযোগীভাবে কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।


তাদের জানতে হবে—


* শরীর ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মূল্য;

* সম্মতি বা consent-এর গুরুত্ব;

* অন্যের ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্মান করা;

* অনলাইনে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য নিরাপদ রাখা;

* আবেগের বশে এমন,  কোনো ছবি বা ভিডিও না পাঠানো, যা পরে বিপদ তৈরি করতে পারে;

* কারও ওপর চাপ প্রয়োগ না করা এবং চাপের কাছে নতি স্বীকার না করা;

* বন্ধুত্ব, ভালো লাগা ও দায়িত্বশীল সম্পর্কের পার্থক্য;

* পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্ব;

* প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল ও অনলাইন হয়রানির ঝুঁকি;

* প্রয়োজন হলে বাবা-মা, শিক্ষক বা বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্কের সাহায্য নেওয়া।


এই শিক্ষাকে অশ্লীলতা শেখানো মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং সঠিক বয়সে সঠিক ভাষায় বাস্তবতার শিক্ষা দেওয়া হলো অশ্লীলতা প্রতিরোধের অন্যতম উপায়।


ধরা যাক, কোনো কিশোর তার সহপাঠীকে পছন্দ করে। বিষয়টি বন্ধুরা জেনে গেল। এরপর শুরু হলো হাসাহাসি, ডাকনাম, গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা তাকে সবার সামনে অপমান করা।


এখানে সমস্যাটি প্রেম নয়; সমস্যাটি হলো অন্যের ব্যক্তিগত অনুভূতিকে বিনোদনে পরিণত করা।


একজন মানুষের আবেগ যতই অপরিণত হোক, সেই আবেগ নিয়ে তাকে অপমান করার অধিকার অন্য কারও নেই।


আমাদের মনে রাখা দরকার- আজ যে কিশোরকে নিয়ে আমরা হাসছি, একসময় আমরাও হয়তো কারও প্রতি এমনই দুর্বলতা অনুভব করেছি। পার্থক্য শুধু এতটুকু- আমাদের সময়ের গোপন চিঠি হয়তো আজকের মতো মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের হাতে পৌঁছাত না।


কিশোর-কিশোরীদের সম্পর্ক নিয়ে গুজব ছড়ানোকে আমরা অনেক সময় নিছক মজা মনে করি। কিন্তু একটি গুজব একজন তরুণের আত্মসম্মান, মানসিক শান্তি, পারিবারিক সম্পর্ক এমনকি শিক্ষাজীবনেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।


কেউ কারও সঙ্গে কথা বললেই তারা প্রেম করছে- ড়এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি কারও বন্ধুত্বকে প্রেমের গল্প বানিয়ে প্রচার করাও অনৈতিক।


বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি গুজবের জীবনকাল কয়েক মিনিট হলেও তার ক্ষতি হতে পারে বহু বছরের।


তাই কারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া মন্তব্য করা, পোস্ট করা বা অন্যের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া থেকে আমাদের বিরত থাকা উচিত।


ছেলে-মেয়ের মেলামেশা নিয়ে আমাদের সমাজে দুই ধরনের চরম অবস্থান দেখা যায়। একদল মনে করেন, যেকোনো ধরনের মেলামেশাই বিপজ্জনক। অন্যদল মনে করেন, কোনো সীমারেখার প্রয়োজন নেই।


দুই অবস্থানের কোনোটিই পরিপূর্ণ সমাধান নয়।


স্বাভাবিক সামাজিকীকরণের সঙ্গে দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান ও ব্যক্তিগত সীমারেখার শিক্ষা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়ের সহশিক্ষা থাকলেই যে অশালীনতা তৈরি হবে- এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। আবার শুধু একসঙ্গে পড়াশোনা করলেই সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে- এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।


পরিবেশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষা ও সংস্কৃতি।


একজন ছেলে যদি ছোটবেলা থেকেই শেখে যে মেয়েটি তার মতোই একজন পূর্ণ মানুষ, তারও সম্মান আছে, ব্যক্তিগত সীমা আছে, নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার আছে- তাহলে তার আচরণে দায়িত্বশীলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।


একইভাবে একজন মেয়েকেও জানতে হবে নিজের নিরাপত্তা, আত্মসম্মান ও সীমারেখা রক্ষার অধিকার তার রয়েছে।


সন্তানের চেহারা, পোশাক, খাবার, পড়াশোনা, ফলাফল ও ক্যারিয়ার নিয়ে আমরা যতটা চিন্তিত, তার আবেগ ও মানসিক বিকাশ নিয়ে কি ততটা চিন্তিত ?


অনেক পরিবারে সন্তান পরীক্ষায় খারাপ করলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা হয়। কিন্তু সন্তান কেন চুপচাপ, কেন বন্ধুর সঙ্গে সমস্যা হয়েছে, কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্বাভাবিক আচরণ করছে- এসব নিয়ে কথা বলার সময় হয় না।


সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা তাই অত্যন্ত জরুরি।


সে যেন মনে করে- “আমি ভুল করলে বাবা-মাকে বলতে পারব।”


এই বিশ্বাস তৈরি হলে সন্তান বিপদে পড়লে লুকিয়ে না থেকে সাহায্য চাইতে পারে। তাতে বৈধ ও অবৈধ সম্পর্কের ধারণা দেওয়া সহজতর হবে। 


কোনো কিশোর-কিশোরী কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে জানতে পেরে তাকে অপমান করলে সে হয়তো আর পরিবারের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করবে না।


কিন্তু অনুভূতি তো নির্দেশ দিলেই অদৃশ্য হয়ে যায় না।


বরং গোপনীয়তা বা টপ সিক্রেট বাড়তে পারে। যোগাযোগ আরও লুকানো হতে পারে। তখন বাবা-মায়ের নজরের বাইরে সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। আর সেই সম্পর্ক যদি প্রতারণামূলক বা ক্ষতিকর হয়, তখন ঝুঁকি আরও বেশি।


তাই সন্তানকে বলতে হবে-


“তোমার ভালো লাগা থাকতে পারে। কিন্তু ভালো লাগার সঙ্গে দায়িত্বও আছে।”


এই একটি বাক্য অনেক কঠোর নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।


মানুষ আবেগপ্রবণ প্রাণী। ভালোবাসা, আকর্ষণ, বন্ধুত্ব, অভিমান, ঈর্ষা, বিচ্ছেদ- এসব মানুষের জীবনের অংশ।


কিন্তু আবেগের অস্তিত্ব কোনো আচরণকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ করে না।


কাউকে ভালো লাগতে পারে, কিন্তু তাকে বিরক্ত করার অধিকার নেই।


কাউকে ভালোবাসতে পারে, কিন্তু তার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করার অধিকার নেই।


কাউকে বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু নিজের নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।


কারও সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু পড়াশোনা, দায়িত্ব, পরিবার ও ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।


অর্থাৎ আবেগকে অস্বীকার নয়- আবেগকে পরিচালনা করতে শেখাই হলো পরিণত হওয়ার পথ।


মানুষের জীবন ভুল ও সংশোধনের ধারাবাহিকতা। কেউই জন্মগতভাবে সম্পূর্ণA নিখুঁত নয়। মানুষ ভুল করে, আবার সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেয়।


নৈতিকতার উদ্দেশ্য মানুষকে সারাজীবন অপরাধবোধে ডুবিয়ে রাখা নয়; বরং ভুল থেকে ভালো পথে ফিরে আসার সক্ষমতা তৈরি করা।


কিশোর বয়সে কেউ ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তাকে চিরদিনের জন্য “খারাপ ছেলে” বা “খারাপ মেয়ে” বলে চিহ্নিত করা উচিত নয়। কারণ একটি ভুল আচরণ একজন মানুষের পুরো পরিচয় নয়।


তাকে বুঝতে হবে- কোন আচরণ তার নিজের ক্ষতি করতে পারে, কোন আচরণ অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে এবং কোন সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়।


আগের প্রজন্মের প্রেমের চিঠি হারিয়ে গেলে হয়তো বিষয়টি কয়েকজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু আজকের ডিজিটাল পৃথিবীতে একটি ছবি, ভিডিও, মেসেজ বা স্ক্রিনশট মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।


তাই নতুন প্রজন্মকে শুধু সম্পর্কের শিক্ষা নয়, ডিজিটাল নৈতিকতার শিক্ষাও দিতে হবে।


তাদের শেখাতে হবে- অনলাইনে যা প্রকাশ করা হয়, সেটি সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। অন্যের ছবি বা ব্যক্তিগত বার্তা অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা অন্যায়। কাউকে অপমান করার জন্য তার ব্যক্তিগত বিষয়কে ভাইরাল করা কোনোভাবেই বিনোদন নয়।


ডিজিটাল নাগরিকত্বও নাগরিক শিক্ষার অংশ।  


আমরা এমন একটি পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তথ্য পাওয়ার বয়স কমেছে, যোগাযোগের সুযোগ বেড়েছে, সামাজিক সম্পর্কের ধরন বদলেছে।


এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মানসিক প্রস্তুতিও বয়সোপযোগী ভাবে গড়ে তুলতে হবে।


তবে এর অর্থ এই নয় যে শিশুদের অল্প বয়সেই প্রাপ্তবয়স্কদের জগতের সব বিষয় দিয়ে ভারাক্রান্ত করতে হবে। বরং বয়স, মানসিক পরিপক্বতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে শিক্ষা দিতে হবে।


শৈশবে শরীরের নিরাপত্তা।


কৈশোরে আবেগ, সম্মতি ও সীমারেখা।


যৌবনে দায়িত্বশীল সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।


এই ধারাবাহিক শিক্ষাই একটি সুস্থ প্রজন্ম গঠনে সহায়ক হতে পারে।


আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম চাই যারা প্রেম শব্দটিকেই ভয় পাবে ?


নাকি এমন একটি প্রজন্ম চাই যারা ভালোবাসার অর্থ বুঝবে, কিন্তু দায়িত্বহীনতাকে ভালোবাসা বলে ভুল করবে না ?


আমরা কি এমন তরুণ চাই যারা বিপদে পড়লে সবকিছু গোপন করবে ?


নাকি এমন সন্তান চাই যারা বাবা-মাকে বিশ্বাস করে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারবে ?


আমরা কি এমন সমাজ চাই যেখানে কারও ব্যক্তিগত আবেগ জনসমক্ষে হাসির বিষয় ?


নাকি এমন সমাজ চাই যেখানে মানুষ অন্যের অনুভূতি ও ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতি সম্মান দেখাবে ?


উত্তরটি খুব কঠিন নয়।


আমাদের প্রয়োজন এমন প্রজন্ম, যারা আবেগপ্রবণ হবে কিন্তু দায়িত্বহীন হবে না; আধুনিক হবে কিন্তু অশালীন হবে না; স্বাধীনচেতা হবে কিন্তু অন্যের অধিকার অস্বীকার করবে না; সম্পর্ক করবে কিন্তু সম্মান ও সীমারেখা বুঝবে।


কোন বয়সে প্রেমের আগ্রহ আসে- এই প্রশ্নের একক উত্তর নেই। কৈশোরে আকর্ষণ তৈরি হওয়া মানবিক বিকাশের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই অনুভূতিকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সেটিই আসল শিক্ষা।


আমাদের ছোট ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাতিজী, ভাগিনা-ভাগিনী কিংবা আশপাশের কিশোর-কিশোরীদের কারও প্রতি ভালো লাগা তৈরি হলে তাদের নিয়ে হাসাহাসি না করে পাশে দাঁড়ানো উচিত। অপমান না করে বোঝানো উচিত। গুজব বা রিউমারস না ছড়িয়ে গোপনীয়তা ও রেস্টিকক্রেটেড এর মূল্য শেখানো উচিত। ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে না দিয়ে সত্য ও দায়িত্বের পথ দেখানো উচিত।


কারণ আবেগকে নিষেধ করে মানুষকে আবেগহীন করা যায় না। বরং সঠিক শিক্ষা দিয়ে আবেগকে দায়িত্বশীল করে তোলা যায়।


নৈতিকতা মানে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়। নৈতিকতা হলো- নিজের স্বাধীনতার সঙ্গে অন্যের অধিকারের ভারসাম্য বোঝা।


প্রেম মানুষের জীবনে আসতেই পারে। ভালো লাগা জন্মাতেই পারে। কিন্তু সেই ভালো লাগা যেন কাউকে অপমান না করে, কারও নিরাপত্তা নষ্ট না করে, কারও ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম না করে এবং নিজের ভবিষ্যৎকেও ধ্বংস না করে- এই বোধটুকু গড়ে তোলাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্ব।


আমরা যদি কিশোরদের অনুভূতিকে বুঝতে শিখি, তাদের সঙ্গে কথা বলতে শিখি এবং বয়সোপযোগী নৈতিক শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্মকে শুধু “প্রেম থেকে দূরে” রাখা নয়- প্রেম, সম্পর্ক, স্বাধীনতা ও দায়িত্বের প্রকৃত অর্থ বোঝাতে পারব।


আর সেখানেই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি সভ্য প্রজন্ম, যারা অনুভূতিকে অস্বীকার করবে না, আবার অনুভূতির নামে সীমালঙ্ঘনও করবে না।


ওমায়ের আহমেদ শাওন 

(লেখক, দার্শনিক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক)



এমকে/বিএম২৪