গুম মামলার আসামি ওসি অসিত কুমার, যেন এক অধরা শক্তি!

প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৩ এএম
গুম মামলার আসামি ওসি অসিত কুমার, যেন এক অধরা শক্তি!

সূত্রঃ ছবি: বিডিমেইল

নিজস্ব প্রতিবেদক


২০১৩ সালে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা সাইফুল ইসলাম হিরু (সাবেক সংসদ সদস্য) ও হুমায়ুন কবির পারভেজকে গুমের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার অন্যতম আসামি, পুলিশ কর্মকর্তা অসিত কুমার রায় বর্তমানে হরিণাকুণ্ডু থানার ওসি (তদন্ত) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। উপ-পরিদর্শক (এসআই) থেকে পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পাওয়া এই পুলিশ কর্মকর্তার অতীতে ঘটানো বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, লাগামহীন ভয়াবহ অপরাধ নেটওয়ার্ক তৈরি ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত থেকেও, একের পর এক অনিয়ম এবং অনৈতিকতা নিয়ে সম্প্রতি, জনমনে সৃষ্টি হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা ও গুরুতর সব অভিযোগ। সেইসাথে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে চলমান মামলার একজন আসামি হয়েও, কীভাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে আছেন, তা নিয়েও ভুক্তভোগী পরিবারের মনে রয়েছে গভীর কৌতূহল।


আসকের তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলে ২০১৩ সাল ইতিহাসের পাতায় একটি কালো অধ্যায়। অভিযোগ রয়েছে, সেসময় সরকারের বিশেষ নির্দেশে সারাদেশ ব্যাপী বিরোধী মত দমনে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে ক্রসফায়ার মিশন; যেকোনো মূল্যে ক্ষমতার চেয়ার ধরে রাখার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন এবং পূর্ববর্তী বছরের নভেম্বর মাসে শুরু হওয়া যৌথবাহিনীর এক ভয়াবহ কিলিং মিশন, যা অব্যাহত ছিল নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। 


বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসজুড়ে সারাদেশে র‍্যাব, বিজিবি ও পুলিশের হাতে বিএনপি ও জামায়াতের সর্বমোট ২০৮ জন নেতাকর্মী খুন ও গুমের ঘটনা ঘটে। সেসময়, ১৩৭ জনকেই কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে সরাসরি হত্যা করা হয়। বাকিদের কোন খোঁজ আজও মেলেনি। 


ক্ষমতার পালাবদলে চলছে নতুন হিসেব-নিকেশ। বিচার বহির্ভূত সকল হত্যা ও গুমের ঘটনায় সরকারের দৃঢ়চেতা পদক্ষেপের অন্তরালে, প্রশাসনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একজন অসিত কুমার রায় ও তাদের অনুসারীদের অবাধ বিচরণ, স্বজন হারানো পরিবারের সকলকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। 


বর্তমানে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু থানার ওসি (তদন্ত) অসিত কুমার রায় সেসময় কুমিল্লা র‍্যাব-১১ তে কর্মরত থাকাকালীন এমনই একটি মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছিল কুমিল্লার লাকসামে। পরিবারের অভিযোগ ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর আনুমানিক রাত আটটায় বিএনপির এই শীর্ষ নেতা সাইফুল ইসলাম হিরু, তাঁর বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহকর্মী হুমায়ূন কবির পারভেজ এবং জসিম উদ্দিন কুমিল্লা-লাকসাম মহাসড়ক থেকে ঢাকা আসার পথে গুমের শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনায় মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন তৎকালীন সময়ে র‍্যাব-১১-তে থাকা (তৎকালীন এসআই) অসিত কুমার রায়। 


এ বিষয়ে গুমের শিকার সাইফুল ইসলাম হিরুর ছেলে রাফসানুল ইসলাম বলেন, ২৭ নভেম্বর, ২০১৩। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। রাত আনুমানিক সাড়ে আটটা। তখন বিএনপি জোটের ডাকা অবরোধ চলছিলো। জরুরি কাজে আব্বু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ওনার আরও দুই সহকর্মী। লাকসাম সদরে ‘বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার মিলস’ নামে আমাদের একটি ময়দার ফ্যাক্টরি রয়েছে। সন্ধ্যার পর ফ্যাক্টরির হিসাব-নিকাশ শেষ করে, ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন আব্বু। ফ্যাক্টরি থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরে সেখানে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী। ফ্যাক্টরিতে অভিযান চালানোর আগে লাকসাম শহরের পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। অভিযানকালে ফ্যাক্টরিতে আমার দুইজন আঙ্কেল, দুইজন ব্যাংক কর্মকর্তা বসে কথা বলছিলেন। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যও না। বৃহস্পতিবার হওয়ায় প্রতি সপ্তাহের কালেকশনটা সেদিন হয়। ফ্যাক্টরিতে র‌্যাবের অভিযানের খবর ঘটনার কিছুক্ষণ পরে আমরা জানতে পারি। তখন আমি, আম্মু, আমার দুই বোন ঢাকার বাসায়।

 

তিনি জানান, স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে জানতে পারি, রাত প্রায় সাড়ে আটটার দিকে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার হরিশ্চর সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে আব্বুদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি (ঢাকা মেট্রো-ছ-৭১-১২৬৫) আটক করে। পরে ভ্যানে করে তাদের একটি খোলা মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। ফ্যাক্টরি থেকে যাদের আটক করা হয়েছিলো তাদেরও ভ্যানে করে মাঠে নিয়ে আসা হয়। পরে আব্বুর সঙ্গে থাকা অন্য দুজনকে ওই ভ্যানে ওঠানো হয় সাতজনের সঙ্গে। যেখানে তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় এক কর্মকর্তার মোবাইলে একটি কল আসে। তিনি কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই নয়জনের ভ্যান থেকে হুমায়ুন কবীর পারভেজকে আবার আব্বুর ভ্যানে উঠানো হয়। আটজনের ভ্যানটি নেয়া হয় লাকসাম থানায়। থানায় গিয়ে আব্বু এবং পারভেজকে না দেখে আমাদের পরিবারের সদস্যরা এ ব্যাপারে পুলিশের কাছে জানতে চায়। কিন্তু পুলিশ কোনো জবাব দেয়নি। পরে, যোগাযোগ করি তৎকালীন লালমাই এলাকার হরিশ্চরের পুলিশ ফাঁড়িতে। তারাও জানেন না বলে জানান। পরে শুক্রবার গেল, শনিবার গেল। এর মধ্যে আমরা অনেক জায়গায় খুঁজেছি। আব্বুর খোঁজ চেয়ে অনেকের দ্বারস্থ হয়েছি। কিন্তু কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারেননি। পরে রোববারে আমরা কোর্টে যাই। সেখানে বাকিদের হাজির করা হলেও আব্বু এবং তার সঙ্গের জনকে আদালতে হাজির করা হয়নি। উপায় না পেয়ে আবার লাকসাম থানায় গেলাম মামলা করার জন্য। কিন্তু পুলিশ মামলা নিবে না বলে জানায়। পুলিশ ঘটনার প্রমাণ চায় আমাদের কাছে। 


তিনি আরও বলেন, পরে কোনো উপায় না পেয়ে ‘বাবা হারিয়ে গেছে’- এই মর্মে একটি জিডি করি লাকসাম থানায়। সেখান থেকে আমরা যাই র‌্যাব-১১ এর নারায়ণগঞ্জ অফিসে। তৎকালীন র‌্যাব-১১ এর কর্মকর্তা তারেক সাঈদের সঙ্গে কথা বলে আমার পরিবার। তিনিও বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেননি। র‌্যাব সেদিন অভিযান চালালেও, আমার বাবাকে আটক করেনি বলে জানানো হয়। পরে আব্বুর সন্ধান চেয়ে আমরা বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করেছি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার কাছে চিঠি দিয়েছি। যেখানেই বাবার খোঁজ আছে শুনেছি, সেখানেই ছুটে গেছি। এখনো বাবাকে খুঁজি। দিন-রাত খুঁজি। কিন্তু বাবাকে পাই না। জানি না, বাবা আর কখনো আমাদের মাঝে ফিরবেন কিনা!


ঘটনার পর থেকেই পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, স্থানীয় বিএনপির ওই দুই শীর্ষ নেতাকে র‍্যাব সদস্যরা অপহরণের পর গুম করেছেন। অপহরণ ও গুমের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৮ মে র‍্যাবের ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে একটি মামলা করেন হুমায়ুন কবিরের বাবা রঙ্গু মিয়া। থানা–পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও তাতে নারাজি দিয়েছেন বাদী। কয়েক দফা তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। 


তথ্যসূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট ছেলে হারানোর শোকে মারা যান মামলার বাদী রঙ্গু মিয়া। বর্তমানে রঙ্গু মিয়ার ছোট ছেলে গোলাম ফারুক মামলাটির বাদী।


ওই মামলার আসামিরা হলেন, র‍্যাব-১১–এর বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া সাবেক অধিনায়ক (সিইও) ও নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, র‍্যাব-১১–এর তৎকালীন কুমিল্লা ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা কোম্পানি অধিনায়ক-২ মেজর শাহেদ হাসান (রাজীব), উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) শাহজাহান আলী, উপপরিদর্শক (এসআই) অসিত কুমার রায় (বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু থানার ওসি তদন্ত) ও এসআই কাজী সুলতান আহমেদ।


এ সম্পর্কে নিখোঁজ হুমায়ুন কবিরের স্ত্রী শাহনাজ আক্তার বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনামতে র‍্যাবই এই গুম করেছে। লাকসামের এই শীর্ষ দুই নেতাকে গুম করার মূল কারণ হলো রাজনীতি। তাঁদের সরিয়ে প্রতিপক্ষ দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতা লাভবান হয়েছিলেন। রাজনীতির প্রেক্ষাপট সামনে এলেই আমরা গুমের নেপথ্যে থাকা অদৃশ্য ‘নূর হোসেনকে’ কল্পনা করতে পারি। তবে তিনি এখনো আড়ালে আছেন।


অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সময়ে কুমিল্লা র‍্যাব-১১-তে থাকা এসআই অসিত কুমার রায় আওয়ামী লীগ সরকারের মিশন বাস্তবায়নে বেপরোয়াভাবে কাজ করছিলেন। সেসময় র‍্যাব-১১ এর দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তারেক সাইদের সাথেও তার গভীর সখ্যতা ছিল। মাঠ পর্যায়ে বিএনপি নেতা ও জামায়াত নেতা-কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ ও ক্রসফায়ার মিশনে লিড দিতেন অসিত কুমার রায়। সেসময় একজন ক্রসফায়ার স্পেশালিস্ট হিসেবেই তাকে র‍্যাব-১১-তে পোস্টিং দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।


সেদিনের ঘটনার কথা বলতে গেলে এখনো আঁতকে ওঠেন অ্যাম্বুলেন্সে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের তিনজনকে আটকের পর চোখ বেঁধে ফেলা হয়। ওই দিন মধ্যরাতে চোখ খোলার পর দেখি, আমি লাকসাম থানায় রয়েছি। তখন চারদিকে খোঁজ করেও হিরু (সাইফুল) ও হুমায়ুন ভাইকে দেখতে পাইনি। আমাকে র‍্যাব থানায় দিয়ে আসে। র‍্যাব-১১ এর অন্যান্য কর্মকর্তা ও সদস্যদের সাথে অসিত কুমার রায় আমাদেরকে হ্যান্ডওভারের সময় উপস্থিত ছিল। তার মানে র‍্যাবই তাঁদেরকে গুম করেছে। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।’


কান্না বিজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘লাকসামের নয়নের মণি হিরু ও পারভেজ ভাইয়ের সন্ধানে বেঁচে ফেরার পরে আমি অনেক জায়গায় খোঁজ করেছি। কেউ সন্ধান দিতে পারেনি। পাঁচ আগস্টের পরে আওয়ামী সরকারের পতন হলে আমরা ডিজিএফআই কর্তৃক প্রাপ্ত আয়না ঘর ও প্রশাসনের দ্বারে-দ্বারে ঘুরেও, তাঁদের কোন খোঁজ পাইনি। আমাদের একটাই দাবি, অসিত কুমার রায় সহ গুমের ঘটনায় জড়িতদের কঠিনভাবে জেরা করা হোক। সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। বিগত সরকারের আমলে বিচার হয়নি। বর্তমান সরকারের আমলে দোষীদের কঠিনতম বিচার দাবি করছি। তারা এখনো কীভাবে বহাল তবিয়তে আছে? পুরো লাকসামবাসী তাঁদের নয়নের মণি হিরু এবং পারভেজ ভাইয়ের সাথে সেদিন কী ঘটেছিল, তা জানতে চায়। আসামিদেরকে অতি দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হোক।’


এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন ২০১৩ সালে কুমিল্লা র‍্যাব-১১-এ কর্মরত তৎকালীন এসআই এবং বর্তমানে হরিণাকুণ্ডু থানার ওসি (তদন্ত) অসিত কুমার রায়। একপর্যায়ে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।’


এমকে/বিডিমেইল২৪