বিশ্ব বাঁশ দিবস ও বাঙালির ‘বাঁশ’: পরিসংখ্যানের চোখে সীমানা ছাড়িয়ে বাঁশ
বিশ্ব বাঁশ দিবস ও বাঙালির ‘বাঁশ’: পরিসংখ্যানের চোখে সীমানা ছাড়িয়ে বাঁশ
আজ ১৮ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব বাঁশ দিবস। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, শিল্প ও ক্ষুদ্র অর্থনীতিতে বাঁশের বহুমুখী ভূমিকা তুলে ধরতে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি উদযাপিত হয়। বিশ্ব বাঁশ সংস্থার উদ্যোগে ২০০৯ সালের অষ্টম বাঁশ কংগ্রেসে প্রবর্তিত এই দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘Bamboo Beyond Borders’ বা ‘সীমানা ছাড়িয়ে বাঁশ’। কিন্তু এই 'সীমানা ছাড়ানোর' গল্পের মাঝে বাঙালি হিসেবে আমাদের কাছে 'বাঁশ' বিষয়টি একটু ভিন্ন মাত্রা পায়। কথায় কথায় “বাঁশ খাওয়া” কিংবা “বাঁশ দেওয়া” বাঙালির প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়তো পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থীরা!
কথায় আছে, “পরিসংখ্যান নাকি বাঁশের মতো, সোজা করা শক্ত!” আবার অনেকেই রসিকতা করে বলেন, পরিসংখ্যান পড়ার মানেই নিয়মিত বাঁশ খাওয়া। কিন্তু বাস্তব অর্থে, বাঁশের যেমন রয়েছে বৈচিত্র্যময় ব্যবহার, পরিসংখ্যানের ‘বাঁশ’ও তেমনই আধুনিক বিশ্বের সব ক্ষেত্রে বিস্তৃত।
বাঙালি জীবনের সঙ্গে বাঁশের সম্পর্ক গভীর। একদিকে পল্লী বাংলার ঘরবাড়ি নির্মাণ, আসবাবপত্র, কুটির শিল্প কিংবা হস্তশিল্পের প্রধান কাঁচামাল বাঁশ; অন্যদিকে আমাদের কথ্য ভাষায় বাঁশ হলো জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা, কঠিন পরিস্থিতি কিংবা অপ্রত্যাশিত ধাক্কার প্রতীক। তবে প্রকৃতির এই দ্রুততম বর্ধনশীল উদ্ভিদটি কেবল রূপক বা লোকশিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় চমৎকার ভূমিকা পালন করে।
পরিসংখ্যানের ছাত্রদের জীবনে বাঁশ খাওয়ার গল্পটা শুরু হয় P-value, Normal Distribution, Variance কিংবা Regression Analysis-এর মধ্য দিয়ে।
একটি ভুল আউটলায়ার বা ডেটা পয়েন্ট কীভাবে সম্পূর্ণ গড়ের মান এলোমেলো করে দিতে পারে, তা কেবল একজন পরিসংখ্যানের শিক্ষার্থীই বোঝে।
পরিসংখ্যানের মডেলে অনুমান বা Hypothesis ভুল হলে পুরো গবেষণার ফল যে বাঁশের বাঁশির বদলে বিকট শব্দে পরিণত হয়, তা অজানা নয়।
বাঁশ যেমন সোজা কিন্তু নমনীয়, ঠিক তেমনই পরিসংখ্যানের ডেটাও নিরপেক্ষ, কিন্তু সেটিকে যথাযথ অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে জীবনের যে কোনো সমস্যা সমাধানে নমনীয়ভাবে প্রয়োগ করা যায়।
আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘Bamboo Beyond Borders’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বাঁশ শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের উদ্ভিদ নয়; এটি এক আন্তর্জাতিক টেকসই অর্থনৈতিক সম্পদ। বাঁশভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি, প্লাস্টিকের বিকল্প ইকো-ফ্রেন্ডলি পণ্য প্রস্তুত এবং বৃহৎ পরিসরে কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্যে বাঁশের সম্ভাবনা অপার।
একইভাবে, পরিসংখ্যানের যে ‘বাঁশ’ খেয়ে শিক্ষার্থীরা দিনরাত পার করেন, তা-ও কিন্তু সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ডেটা সায়েন্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং কিংবা বিগ ডেটা আধুনিক পৃথিবীর সব প্রযুক্তির মূলেই রয়েছে এই পরিসংখ্যান। তাই পরিসংখ্যানের এই ‘বাঁশ’ বাস্তবে আপনাকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে তোলে।
বিশ্ব বাঁশ দিবসে তাই আমাদের ভাবনা হওয়া উচিত ইতিবাচক। জীবনের দৈনন্দিন বাঁশ কিংবা একাডেমিক জীবনের পরিসংখ্যানের কঠিন বাঁশ সবকিছুকেই নমনীয়তা ও টেকসই দৃষ্টিভঙ্গিতে টেক্কা দেওয়াই আসল দক্ষতা। বাঁশ পরিবেশ রক্ষা করুক, অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করুক, আর পরিসংখ্যানের বাঁশ আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি জোগাক।
লেখা:
মোঃ জাহেরুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ
ঢাকা কলেজ।









