আগেও হয়েছে চেষ্টা, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলে মরিয়া অনেকেই

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
আগেও হয়েছে চেষ্টা, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলে মরিয়া অনেকেই

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


মিরপুর-১-এর ডি ব্লকে ১০ কাঠা জমির ওপর ১৯৭৬ সাল থেকে দরিদ্র, অসহায় নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। এখানেই সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হয়ে আসছে।


জানা গেছে, জমিটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনাপত্তিপত্রের শর্তে ১৯৮৪ সালে রাড্ডাকে সেখানে স্বাস্থ্য ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর প্রায় পাঁচ দশক ধরে ওই জমিতে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।


স্থায়ীভাবে জমিটি পাওয়ার জন্য রাড্ডার পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়েছে, যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। অন্যদিকে, ২০০৫ সাল থেকে বরাদ্দের সূত্রে জমিটির মালিকানা দাবি করে আসছে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় মালিক সমিতি’। গত ২৯ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে দেওয়া একটি আবেদনে সমিতির তৎকালীন সভানেত্রী ও বর্তমান সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির স্বাক্ষর রয়েছে।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাড্ডার জায়গাটি দখলের চেষ্টা নতুন নয়। ২০০৯ ও ২০১৯ সালে অন্তত তিনটি পৃথক গ্রুপ জায়গাটি দখলের চেষ্টা করেছিল। স্থানীয়দের বাধা এবং নিজেদের মধ্যে বিরোধের কারণে তারা সফল হয়নি।


২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার পর কাজী টিপু সুলতানও জমিটি তাদের পারিবারিক সম্পত্তি দাবি করে দখলের চেষ্টা করেছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। তবে জমিটি সরকারি খাস জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত থাকায় তিনি দখল নিতে পারেননি।


২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিপু সুলতান ও তার অনুসারীরা এলাকা ছেড়ে চলে গেলে জমিটি দখলে নিতে বিএনপির দুটি পক্ষ সক্রিয় হয় বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জগলুর পাশা পাপেল, যিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা আক্তার তুলির অনুসারী হিসেবে পরিচিত। দুই পক্ষই ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র ব্যানারে জমিটি দখলের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


এদিকে জমিটির মালিকানা নিয়ে আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা এবং একটি রিটও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।


রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, জায়গাটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের। ১৯৭৬ সাল থেকে তারা সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ১৯৮৪ সালে সরকারের সঙ্গে রাড্ডার একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, যতদিন রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করবে, ততদিন সেখানে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি।


তিনি বলেন, এরপর থেকে একদিনের জন্যও সেবাকেন্দ্রটি বন্ধ হয়নি। এখান থেকে সরকারের ইপিআই টিকা কার্যক্রমের প্রায় ৬০ শতাংশ কাভারেজ, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রসূতি নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হতো। এ কারণে দরিদ্র মানুষের কাছে এটি ‘গরিবের হাসপাতাল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।


নাসরিন আখতার আরও বলেন, এর আগেও সেবাকেন্দ্রটি দখলের একাধিক চেষ্টা হয়েছে। তবে কেউ সফল হয়নি। এ নিয়ে এখনো একটি মামলা চলমান রয়েছে।


স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার আগে সমমনা দোকানদার সমিতি কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি।


স্থানীয় বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, এই সেবাকেন্দ্র থেকে এলাকার ধনী-গরিব সবাই প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। কারও যদি জমির ওপর বৈধ দাবি থাকে, তাহলে আইনি প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে জমি বুঝে নেওয়া উচিত। রাতের আঁধারে বুলডোজার দিয়ে একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।


তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই স্থানীয়রা জায়গাটিকে সরকারি জমি হিসেবে জেনে আসছেন। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের দলের লোকজন এ জায়গা দখলের চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।


রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক জানান, হামলায় সেবাকেন্দ্রটির আনুমানিক দেড় কোটি টাকার মালামাল লুট হয়েছে। লুট হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ইপিআই টিকার সরঞ্জাম, সরকারি রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, তিনটি স্টিলের আলমারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাব।


তিনি বলেন, হামলাকারীরা শিশুদের টিকা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সব নথিও নিয়ে গেছে। এসব নথির ভিত্তিতে শিশুদের টিকার জন্য ফোন করা হতো। এখন নথিগুলো না থাকায় অনেক শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


হামলার অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও মোস্তফা জগলুর পাশা পাপেলের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।


রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তিনি বলেন, এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি মর্মাহত। রাতের অন্ধকারে বুলডোজার এনে কয়েক ঘণ্টা ধরে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।


তিনি জানান, এ ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাহ আলী থানার ওসিকে ক্লোজ করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সেবা দিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।


জমির মালিকানা প্রসঙ্গে আমিনুল হক বলেন, এটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জায়গা। এ বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। কারও কোনো আইনি দাবি থাকলে আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উত্থাপন করতে হবে। রাতের আঁধারে বুলডোজার দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলার অধিকার কারও নেই।


হামলার সময় পুলিশের নীরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন


রাত সাড়ে ১২টা থেকে প্রায় ৩টা পর্যন্ত সেবাকেন্দ্রটিতে ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চললেও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীদের নিবৃত্ত করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।


রাড্ডার প্রশাসক ও কোষাধ্যক্ষ মো. আহসান হাবিব বলেন, হামলার সময় দুই নিরাপত্তাকর্মী অনিন্দ্র সরকার ও আব্দুল হাইকে মারধর করে বেঁধে রাখা হয়। তাদের উদ্ধারের জন্য প্রথমে ওসিকে ফোন করা হয়। পরে সশরীরে গিয়েও অনুরোধ জানানো হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


স্থানীয় বাসিন্দা জামাল বলেন, সেবাকেন্দ্রটি থেকে থানার দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। এরপরও টানা কয়েক ঘণ্টা হামলা ও লুটপাট চললেও পুলিশের কোনো কার্যকর তৎপরতা দেখা যায়নি।


এ ঘটনায় পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। রোববার মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।


পুলিশের গাফিলতির বিষয়টি সামনে আসায় শাহ আলী থানার ওসিকে দায়িত্বে অবহেলার কারণে ক্লোজ করা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। ঘটনায় আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।


গ্রেপ্তারের পর ছয় আসামি কারাগারে


এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার ছয় আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।


কারাগারে পাঠানো আসামিরা হলেন— মো. শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), মো. শাহআলম (৫৩), মো. আতিকুর রহমান (৩৩), মো. কামরুল ইসলাম (৫২) ও মো. শাকিল (২০)।


এমকে/বিএম২৪