যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে সংঘাতের কৌশল বদলাচ্ছে ইরান

প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে সংঘাতের কৌশল বদলাচ্ছে ইরান

সূত্রঃ সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি রুটকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ইরান। উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের লক্ষ্য সরাসরি সামরিক বিজয় নয়; বরং সংঘাতের ব্যয় এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ছাড় দিতে বাধ্য হয়।


বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ইরান পরিকল্পিতভাবে সংঘাতের পরিধি বাড়াচ্ছে, তবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে। তাদের উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বোঝানো যে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের দাবি উপেক্ষা করার চেয়ে চলমান সংকট মোকাবিলা করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল।


তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের ভূমিকা স্বীকার না করলে সংঘাত শুধু পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। একাধিক নৌপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ঝুঁকির মুখে রেখে ভবিষ্যৎ দর-কষাকষিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায় দেশটি।


ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক মাইকেল নাইটস রয়টার্সকে বলেন, ইরান শুরু থেকেই সংঘাতের মাত্রা ধাপে ধাপে বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে, যাতে তারা প্রতিনিয়ত নতুন চাপ সৃষ্টির সুযোগ পায়। তার মতে, ইরানের আসল শক্তি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে আঘাত করার সক্ষমতায় নয়; বরং আঞ্চলিক দেশ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করার ক্ষমতায়।


হরমুজের গণ্ডি ছাড়িয়ে নতুন চাপ


বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা দেখানোর পর ইরান এখন লোহিত সাগর ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকেও সম্ভাব্য চাপের ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্য নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ব্যয় আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে তেহরান।


উপসাগরীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মনে করছে, বাড়তি চাপ সৃষ্টি করলে আরও বেশি কৌশলগত সুবিধা আদায় করা সম্ভব। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক—এই বিষয়টিকেও সুযোগ হিসেবে দেখছে ইরান।


দর-কষাকষিতে শক্ত অবস্থান


তেহরানের ধারণা, অতীতে নমনীয়তা দেখিয়েও তারা কেবল আরও বেশি চাপের মুখে পড়েছে। তাই যেকোনো আলোচনায় বসার আগে শক্ত অবস্থান তৈরি করাই এখন তাদের প্রধান কৌশল। ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্রের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসন ছাড় দেওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখে এবং চাপের ভাষাই বেশি গুরুত্ব দেয়।


ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মাইকেল সিং বলেন, ইরান মনে করছে এখনো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই তাদের হাতে রয়েছে। তাদের লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বাড়ানো এবং সমুদ্রপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।


অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান এয়ারের মতে, ইরানের এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ কমাতে বাধ্য করা এবং সংঘাতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা।


সহনশীলতার লড়াই


ইরানের কৌশলের প্রভাবে এখন আঞ্চলিক ও পশ্চিমা দেশগুলো সরাসরি সামরিক মোকাবিলার পরিবর্তে বাণিজ্যিক নৌপথ ও জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সাম্প্রতিক সামুদ্রিক জোটও মূলত প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করছে, যার লক্ষ্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।


বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বুঝে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তারা এমন কৌশল নিয়েছে, যাতে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি করে প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো যায়।


বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই এখন একে অপরের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। তবে এই পাল্টাপাল্টি চাপের কৌশল শেষ পর্যন্ত এমন একটি সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কোনো পক্ষের পক্ষেই সহজ হবে না।



এমকে/বিএম২৪