মিউচুয়াল ফান্ডে মুনাফা বাড়লেও লভ্যাংশ পেলেন না অধিকাংশ বিনিয়োগকারী

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:১২ এএম
মিউচুয়াল ফান্ডে মুনাফা বাড়লেও লভ্যাংশ পেলেন না অধিকাংশ বিনিয়োগকারী

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের তালিকাভুক্ত অধিকাংশ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে। তবে আগের বছরগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণে মুনাফা করেও অধিকাংশ ফান্ড বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে পারেনি।


সর্বশেষ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এমন ১৫টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের সম্মিলিত নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে একই ফান্ডগুলোর সম্মিলিত মুনাফা ছিল মাত্র ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ১৪১ কোটি টাকার বেশি।


প্রতিবেদন প্রকাশ করা ১৫টি ফান্ডের সবগুলোই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ১১টি ফান্ড আগের বছর লোকসানে ছিল। অন্য চারটি ফান্ডও আগের বছরের তুলনায় বেশি মুনাফা করেছে।


তবে মুনাফা বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে মাত্র চারটি ফান্ড। এসব ফান্ডের লভ্যাংশের হার ৪ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে।


খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে শেয়ারবাজারের পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মুনাফা বেড়েছে। শেয়ারের দাম বাড়ায় ফান্ডগুলোর বিনিয়োগের মূল্যও বেড়েছে এবং অনেক ফান্ড শেয়ার বিক্রি করে মূলধনি মুনাফা করেছে।


ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৭৬৩ পয়েন্টে দাঁড়ায়। একই সময়ে ডিএস৩০ সূচক প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৭৮ পয়েন্টে ওঠে। বাজার মূলধনও বেড়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ৪২১ কোটি টাকা।


মিউচুয়াল ফান্ডগুলো শেয়ারবাজারের বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হওয়ায় বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সুফল পেয়েছে। বিশেষ করে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করা ফান্ডগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।


রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা বিভাগের প্রধান আকরামুল ইসলাম বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডের আয় অনেকাংশেই শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে। শেয়ার কেনাবেচা থেকে মূলধনি মুনাফার পাশাপাশি লভ্যাংশ, সুদ ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকেও ফান্ডগুলো আয় করে। গত অর্থবছরে অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় ফান্ডগুলো ভালো মূলধনি মুনাফা করেছে।


যেসব ফান্ড বেশি মুনাফা করেছে


২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড। ফান্ডটির নিট মুনাফা হয়েছে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা।


দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গ্রামীণ ওয়ান স্কিম-২-এর মুনাফা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। আগের বছর ফান্ডটির মুনাফা ছিল ১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।


আইসিবি এএমসিএল থার্ড এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড ১৪ কোটি টাকা মুনাফা করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। আগের অর্থবছরে ফান্ডটি ২০ লাখ টাকা লোকসান করেছিল।


এ ছাড়া আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড ১৩ কোটি ২৫ লাখ, প্রাইম ব্যাংক ফার্স্ট আইসিবি এএমসিএল মিউচুয়াল ফান্ড ১১ কোটি ৭০ লাখ, আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ১১ কোটি ২০ লাখ, ফনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ৯ কোটি ৮৪ লাখ এবং আইএফআইএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড-১ ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা মুনাফা করেছে।


অন্যদিকে আইসিবি এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান: স্কিম ওয়ান ৮ কোটি ৪০ লাখ, আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ৭ কোটি ৩৫ লাখ, রিলায়েন্স ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ড ৭ কোটি, সিএপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড ৬ কোটি ৭৭ লাখ, এসইএমএল এফবিএলএসএল গ্রোথ ফান্ড ৬ কোটি ৫৭ লাখ, এসইএমএল আইবিবিএল শরিয়াহ ফান্ড ৪ কোটি ৯০ লাখ এবং সিএপিএম আইবিবিএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছে।


লভ্যাংশ দিয়েছে মাত্র চার ফান্ড


মুনাফা করলেও ১৫টি ফান্ডের মধ্যে মাত্র চারটি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে রিলায়েন্স ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ড সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।


ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড ও গ্রামীণ ওয়ান স্কিম-২-এর ট্রাস্টি ৯ শতাংশ করে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আর আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড দিয়েছে ৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ।


বিশ্লেষকদের মতে, লভ্যাংশ না দেওয়ার অন্যতম কারণ আগের বছরগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসান। দীর্ঘদিনের বাজার মন্দায় অনেক ফান্ডের সম্পদের মূল্য কমে যাওয়ায় তাদের পুঞ্জীভূত মুনাফার তহবিল ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। ফলে সাম্প্রতিক মুনাফা দিয়ে আগের ঘাটতি পূরণ না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি।


এ ছাড়া নতুন নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ফান্ড নিট মুনাফা করলেও ট্রাস্টিরা চাইলে নগদ লভ্যাংশ না দিয়ে অর্থ ফান্ডের সুরক্ষায় সংরক্ষণ করতে পারেন।


সম্পদমূল্যের চেয়ে কম দামে ইউনিট লেনদেন


মিউচুয়াল ফান্ড খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাজারদর ও প্রকৃত সম্পদমূল্যের (এনএভি) মধ্যে বড় ব্যবধান। ৩৪টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩০টিই বর্তমানে সম্পদমূল্যের তুলনায় কম দামে বা ডিসকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে।


গত সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, এসব ফান্ডের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৩ হাজার ৭০ কোটি টাকা। বিপরীতে ব্যবস্থাপনায় থাকা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকৃত সম্পদমূল্যের তুলনায় বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা কম।


বিএসইসির নজরেও বিষয়টি এসেছে। বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন সম্পদমূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ডিসকাউন্টে লেনদেন হওয়া মেয়াদি ফান্ডকে বে-মেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর কিংবা অবসায়নের সুযোগ রয়েছে।


ইতোমধ্যে একটি মেয়াদি ফান্ড বে-মেয়াদি ফান্ডে রূপান্তরিত হয়েছে। আরেকটি ফান্ডের রূপান্তর অথবা অবসায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আগামী ৭ অক্টোবর বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বান করা হয়েছে।



এমকে/বিএম২৪