পা ছুঁয়ে সালাম, এরপরই ৪০ বিঘা জমি দখলের অভিযোগ: বদলেছে কি রঘুপতির রাজনৈতিক পরিচয়?
সূত্রঃ সংগৃহীত
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
একসময় আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন রঘুপতি সেন। স্থানীয়ভাবে তিনি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের অনুসারী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পদে থাকা এই নেতাকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন এলাকায় দেখা যায়নি। পরে আবারও স্থানীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন তিনি।
সম্প্রতি বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর চলাফেরার বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের পা ছুঁয়ে সালাম করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটি নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই রঘুপতি সেনের বিরুদ্ধে আনোয়ারার চাতরী ইউনিয়নের কৈনপুরা এলাকায় প্রায় ৪০ বিঘা বিরোধপূর্ণ জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে সেখানে নিজের নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে রঘুপতি সেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি অভিযোগ নিয়ে কথা বলেননি। পুলিশ জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমপির পা ছুঁয়ে সালাম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২৭ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের সামনে গিয়ে নিচু হয়ে তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করছেন রঘুপতি সেন। পরে সংসদ সদস্য তাঁকে কাছে টেনে নেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাষ্য, চাতরী ইউনিয়নের কৈনপুরা এলাকায় একটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন সরওয়ার জামাল নিজাম। সেখানে উপস্থিত লোকজনের ভিড়ের মধ্যে রঘুপতি সেন তাঁকে সালাম করেন। পরে সেই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী বলছেন, রঘুপতি সেন এখনো আওয়ামী লীগের পদে থাকলেও বিএনপির নেতাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে দলের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের পরিচয় ও প্রভাবের পরিধিও বদলানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হায়দার চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তাঁদের দলের জন্য সতর্ক হওয়ার মতো। তাঁর ভাষ্য, কোনো চাঁদাবাজ বা বিতর্কিত ব্যক্তির রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তবে পা ছুঁয়ে সালাম করার ঘটনা নিয়ে রঘুপতি সেনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এমপিকে সালাম করলে আপনার সমস্যা কী?’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
আওয়ামী লীগের পদে থেকেও বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, রঘুপতি সেন দীর্ঘদিন ধরে আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পদেও তাঁর নাম রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তিনি সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
কৈনপুরা উচ্চবিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দাবি, গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে দলীয় সমর্থন পেতে তিনি তৎপর ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় সমর্থন পাননি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর আবার এলাকায় সক্রিয় হন রঘুপতি সেন। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, নির্বাচনের আগে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও বাড়তে দেখা যায়।
তবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বিএনপির পক্ষ থেকেও তাঁকে দলের কোনো পদ দেওয়ার ঘোষণা আসেনি। একইভাবে আওয়ামী লীগের উপজেলা পর্যায়ের পদ থেকে তাঁর পরিবর্তনেরও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
৪০ বিঘা জমি নিয়ে বিরোধ
রঘুপতি সেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি উঠেছে কৈনপুরা এলাকার প্রায় ৪০ বিঘা জমি নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও জমির দাবিদারদের ভাষ্য, জমিটির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে এবং এ বিষয়ে ২০০৮ সাল থেকে আদালতে মামলা রয়েছে।
জমির দাবিদার ৮৫ বছর বয়সী অশোক কুমার দত্তের অভিযোগ, তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তির অংশ রঘুপতি সেন তাঁর ভাতিজা রঞ্জন দত্তের কাছ থেকে দানপত্রের মাধ্যমে নিয়ে রেজিস্ট্রি করেছেন বলে দাবি করছেন। কিন্তু জমিটির মালিকানা নিয়ে তাঁদের পরিবারের চার ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলছে।
অশোক কুমার দত্তের দাবি, এতদিন রঘুপতি সেন জমিটির দখলে যেতে পারেননি। সম্প্রতি লোকজন নিয়ে সেখানে গিয়ে নিজের নামে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এতে তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে বিরোধপূর্ণ জমির একটি অংশে রঘুপতি সেনের নামসংবলিত সাইনবোর্ড দেখা গেছে। সেখানে মাটি ও বালু ফেলার কাজও চলছিল। স্থানীয়দের দাবি, দূরের একটি নদী থেকে পাইপের মাধ্যমে বালু এনে জমি ভরাট করা হচ্ছে।
তবে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রঘুপতি সেনের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর লোকজন জমি ভরাট ও দখল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
অশোক কুমার দত্তের অভিযোগগুলোরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। জমির মালিকানা নিয়ে চলমান মামলার পূর্ণাঙ্গ নথিও প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রঘুপতি সেনের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা রঘুপতি সেনকে এখন বিএনপির স্থানীয় নেতাদের বিভিন্ন কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে।
তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় তাঁর প্রভাবও আবার বাড়ছে। এর মধ্যে বিরোধপূর্ণ জমিতে তাঁর নামে সাইনবোর্ড টাঙানোর ঘটনা সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
তবে রঘুপতি সেন বিএনপিতে কোনো পদ পেয়েছেন বা আনুষ্ঠানিকভাবে দলটিতে যোগ দিয়েছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বিএনপির নেতারাও তাঁকে দলের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো ঘোষণা দেননি।
স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী বলছেন, আওয়ামী লীগের পদধারী বা সাবেক নেতাদের দলে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
পুলিশের বক্তব্য
জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, এ ঘটনায় এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরওয়ার জামাল নিজামের পা ছুঁয়ে সালাম করার ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখছেন।
অন্যদিকে, রঘুপতি সেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েই
রঘুপতি সেনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার এখনো স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। তিনি আওয়ামী লীগের পদে রয়েছেন কি না, বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন কি না—দুই ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, আদালতে বিচারাধীন জমিতে তাঁর নামে সাইনবোর্ড টাঙানো এবং জমি ভরাটের অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে। রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন বা কোনো রাজনৈতিক নেতাকে সৌজন্য দেখানো অপরাধ নয়। তবে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিচারাধীন সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণের বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার। একই সঙ্গে অভিযোগ সত্য হলে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এমকে/বিএম২৪








