নাট্যমঞ্চ থেকে বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল
সূত্রঃ সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছেন, যুক্ত ছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। ছাত্রজীবনে সক্রিয় ছিলেন রাজনীতিতেও। এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব—বহুমাত্রিক পথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে।
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত না হলেও রাষ্ট্রপতি পদে তার প্রার্থিতা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার সম্পৃক্ততা ছিল।
শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি যুক্ত হন তিনি। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর পর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সরকারের সময়ে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও বিএনপির রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। ২০০৯ সালে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন তিনি। পরে বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও গণমাধ্যমে দলের অবস্থান তুলে ধরেন।
২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে সংগঠিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুল বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময়ও তিনি দেশে থেকে দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ায় তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নাট্যমঞ্চ থেকে শুরু করে ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, পৌরসভা, সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং দলীয় নেতৃত্ব—জীবনের নানা অভিজ্ঞতা পেরিয়ে মির্জা ফখরুল এখন বঙ্গভবনের পথে।
ব্যক্তিজীবনে রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ মির্জা ফখরুলের দুই কন্যা রয়েছে। তার পরিবারেরও দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে।
এখন অপেক্ষা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই স্পষ্ট হবে, নাট্যমঞ্চ থেকে শুরু হওয়া মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা শেষ পর্যন্ত তাকে বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছে দেয় কি না।
এমকে/বিএম২৪








