দেশে দণ্ডিত, বিদেশে সুরক্ষিত: শেখ হাসিনা ও আসাদের মধ্যে যত মিল
সূত্রঃ সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
একসময় নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তারা। সরকার, প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছিল তাদের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে দুজনের রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান হয়েছে। ক্ষমতা হারিয়ে দুজনেই এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং নিজ নিজ দেশে তাদের বিরুদ্ধে বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়া চলছে।
তারা হলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ইতিহাস ও সংঘাতের ধরন ভিন্ন হলেও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাদের বর্তমান অবস্থানে কিছু উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
ক্ষমতার আকস্মিক পতন
শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা ১৫ বছর সরকার পরিচালনা করে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলন বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিলে ৫ আগস্ট তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এর মধ্য দিয়ে তার সরকারের পতন ঘটে।
অন্যদিকে ২০০০ সালে সিরিয়ার ক্ষমতায় আসেন বাশার আল-আসাদ। ২০১১ সালের গণআন্দোলনের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া ও ইরানের সহায়তায় দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রযাত্রার মুখে দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ হারান আসাদ। তার পতনের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকের বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটে।
দেশে বিচার ও প্রত্যর্পণের দাবি
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দুজনের বিরুদ্ধেই নিজ নিজ দেশে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তাকে দেশে ফেরাতে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধও জানিয়েছে বাংলাদেশ। তবে ভারত এখনো তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
অন্যদিকে সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষও বাশার আল-আসাদের প্রত্যর্পণ চেয়েছে। তবে রাশিয়া তাকে সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ১১ আগস্ট সিরিয়ার একটি আদালত আসাদের অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এ রায় দেওয়া হয়।
পুরোনো মিত্রের দেশে আশ্রয়
দুই সাবেক শাসকের বর্তমান অবস্থানের আরেকটি বড় মিল হলো—তারা এমন দেশে আশ্রয় পেয়েছেন, যাদের সঙ্গে ক্ষমতায় থাকাকালে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ছিল।
শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে ভারত ও আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ছিল। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও ভারত তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়নি।
আসাদের ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকা আরও প্রত্যক্ষ। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় মস্কো ছিল আসাদ সরকারের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক সমর্থক। ২০১৫ সাল থেকে রুশ সামরিক সহায়তা তার সরকারকে টিকে থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্ষমতা হারানোর পর সেই রাশিয়াতেই আশ্রয় পান তিনি।
তবে পার্থক্যও রয়েছে
দুজনের অবস্থানে মিল থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু থাকা অবস্থায়। তার প্রত্যর্পণের বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যদিকে আসাদের পতনের পর সিরিয়ার পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে এবং নতুন প্রশাসন তার বিরুদ্ধে জবাবদিহির উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সম্পর্কও আগের অবস্থানে নেই।
আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, আসাদের দীর্ঘ শাসন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ওই সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সহিংসতাকে ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগই বিচারপ্রক্রিয়ার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
কতটা স্থায়ী বিদেশের আশ্রয়?
শেখ হাসিনা ও বাশার আল-আসাদের বর্তমান অবস্থাকে নিরাপদ আশ্রয় মনে হলেও এর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত বলছে, বিষয়টি আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হচ্ছে।
আসাদের ক্ষেত্রে রাশিয়ার আশ্রয় তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হলেও সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক মৃত্যুদণ্ডের রায় সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে।
দুজনের ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে বড় মিল হলো—ক্ষমতার শীর্ষ থেকে পতন, দেশত্যাগ, নিজ দেশে বিচার বা প্রত্যর্পণের দাবি এবং পুরোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা বিদেশি রাষ্ট্রে আশ্রয়।
তবে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ও বাশার আল-আসাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এমকে/বিএম২৪








