২৬ বছর একই ব্যক্তির নেতৃত্বে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল, উঠছে অনিয়মের অভিযোগ
সূত্রঃ ফাইল ছবি
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
ট্রাস্ট ডিড অনুযায়ী পাঁচ বছর মেয়াদে ১১ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের কথা। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মনোনীত সদস্যদের মধ্য থেকেই ম্যানেজিং ট্রাস্টি নির্বাচনের বিধানও রয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এসব নিয়ম অনুসরণ না করেই প্রায় ২৬ বছর ধরে একজনের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রয়াত চিকিৎসক ডা. রবিউল হোসেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ না করে দীর্ঘ সময় তিনি ম্যানেজিং ট্রাস্টির দায়িত্বে ছিলেন। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ, ক্রয় কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠানের আবাসন ও গেস্ট হাউস ব্যবহারে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মেয়াদ শেষ হলেও ম্যানেজিং ট্রাস্টি
ট্রাস্ট ডিড অনুযায়ী, সিইআইটিসি ট্রাস্টি বোর্ডে ১১ সদস্য থাকার কথা। বিএনএসবির আজীবন সদস্যদের মধ্য থেকে চারজন, জার্মানির প্রধান দাতা আন্দ্রে হেলফির মনোনীত তিনজন, একজন বেড ডোনার প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, যুক্তরাজ্যের রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটি ফর ব্লাইন্ডের একজন এবং অস্ট্রেলিয়ার ফরসাইটের একজনকে ট্রাস্টি হিসেবে মনোনয়নের বিধান রয়েছে।
দলিলে বলা হয়েছে, আন্দ্রে হেলফির মনোনীত তিন ট্রাস্টির মধ্য থেকেই পাঁচ বছরের জন্য ম্যানেজিং ট্রাস্টি নির্বাচিত হওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ১৯৯৫ সালে আন্দ্রে হেলফি তিনজন ট্রাস্টিকে মনোনয়ন দেন। তাঁদের মেয়াদ শেষ হয় ২০০০ সালে। এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নতুন মনোনয়ন ও নির্বাচন না করে ডা. রবিউল হোসেন দীর্ঘদিন ম্যানেজিং ট্রাস্টির দায়িত্বে ছিলেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০০০ সালের পর ট্রাস্ট ডিড অনুযায়ী নতুন করে মনোনয়ন ও নির্বাচন না হয়ে একই ব্যক্তির নেতৃত্বে ট্রাস্ট পরিচালিত হলে তা দলিলের শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পরিবারের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের অভিযোগ
ডা. রবিউল হোসেনের পরিবারের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর বড় ছেলে ডা. রাজীব হোসেনকে বোর্ড অব ট্রাস্টির অনুমোদন ছাড়াই ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর করা হয়। এ সময় তাঁকে মাসিক প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা বেতন, আবাসন, পরিবহনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের সার্ভিস রুলস অনুযায়ী একই ব্যক্তি একই সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারেন না—এমন দাবি করে সংশ্লিষ্টরা তাঁর নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় কার্যক্রমও ডা. রাজীব হোসেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিদেশি উচ্চতর ডিগ্রি ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও অভিযোগকারীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এসব দাবির পক্ষে স্বাধীন নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছোট ছেলের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
ডা. রবিউল হোসেনের ছোট ছেলে রিয়াজ হোসেনকে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রথমে ডিরেক্টর—স্ট্র্যাটেজিক কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট, পরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সর্বশেষ হেড অব অপারেশনস পদে দায়িত্ব পালন করেন।
এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। সংশ্লিষ্ট পদগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের ক্রয় কার্যক্রমও তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া খুলশী থানায় করা একটি অর্থ আত্মসাতের মামলাকে ঘিরেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ৮৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের ওই মামলার চার্জশিটে প্রায় ৯০ কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটিতে রিয়াজ হোসেন কারাগারেও ছিলেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
তবে বিচারাধীন মামলায় আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না।
গেস্ট হাউস ও আবাসন ব্যবহারে প্রশ্ন
হাসপাতালের সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই হাসপাতালের গেস্ট হাউস ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত আবাসন এবং ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল স্টাফদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাট পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এসব সম্পদ ব্যবহারের অনুমতি কে দিয়েছেন, কী শর্তে দেওয়া হয়েছিল এবং এতে প্রতিষ্ঠানের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না—তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
ক্রয় ও নির্মাণকাজেও অনিয়মের অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানের ক্রয় ও নির্মাণকাজ নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যোগ্যতার পরিবর্তে আত্মীয়স্বজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়ে তাঁদের উচ্চ বেতন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রাস্টি সদস্য মনোনয়ন, মাল্টিপারপাস ভবনের বাজেট বাড়ানো, নির্মাণকাজের তদারকি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের প্রতিষ্ঠান ছাড়ার অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাঁদের দাবি, ডা. রাজীব হোসেন ও তাঁর বাবা ডা. রবিউল হোসেনের প্রশাসনিক আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে প্রতিষ্ঠালগ্নের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চক্ষু বিশেষজ্ঞ হাসপাতাল ছেড়ে যান। পরে তাঁদের কেউ কেউ চট্টগ্রামে শেভরন চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন।
তবে চিকিৎসকদের প্রতিষ্ঠান ছাড়ার প্রকৃত কারণ এবং শেভরন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এসব ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রয়োজন স্বাধীন নিরীক্ষা ও তদন্ত
সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম কতটা স্বচ্ছ ছিল, ট্রাস্ট ডিড অনুযায়ী পরিচালনা কাঠামো অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়োগে বোর্ডের অনুমোদন ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, গত প্রায় ২৭ বছরে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল ও ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রমে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে এই বিপুল অঙ্কের দাবির পক্ষে পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা প্রতিবেদন বা স্বাধীন তদন্তের ফল প্রকাশ্যে না আসায় এর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তাঁদের দাবি, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত এই ট্রাস্টের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে স্বাধীন নিরীক্ষা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে ট্রাস্ট ডিড লঙ্ঘন, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, প্রতিষ্ঠানের সম্পদের ব্যক্তিগত ব্যবহার কিংবা ক্রয় ও নির্মাণকাজে অনিয়মের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ট্রাস্টি মনোনয়ন, দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির ম্যানেজিং ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন, পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ এবং ক্রয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা—সব বিষয় নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হলে অভিযোগের সত্যতা ও বাস্তব পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে।
এমকে/বিএম২৪









