দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নয়: ইউএনও উম্মে ইমামা বানিন
সংগৃহীত
মো. আরিফুল ইসলাম, পাবনা জেলা প্রতিনিধি
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পাবনার ফরিদপুর উপজেলার পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে ইমামা বানিন। পূজামণ্ডপে বিশৃঙ্খলা, উসকানি, মাদক, ইভটিজিং, নারী ও শিশু হয়রানি কিংবা দুষ্কৃতকারীদের তৎপরতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা শনাক্ত ও প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানান।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১১টায় উপজেলা কৃষি অফিসের সামনে শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ উপলক্ষে পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে আয়োজিত প্যারেড ব্রিফিংয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্রিফিংয়ে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদা সুলতানা, ফরিদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হেলাল এবং উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি প্রদ্বীপ। এ ছাড়া রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা মো. তাজিনুর ইসলাম।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদা সুলতানা বলেন, প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে পূজা উদযাপন ও প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পূজামণ্ডপগুলোতে বিশেষ নজরদারি, পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত দায়িত্ব পালন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে।
ফরিদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হেলাল বলেন, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা নয়; এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক দায়িত্বশীলতারও বিষয়। উপজেলার পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা, নির্বিঘ্ন চলাচল এবং শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় আচার পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও উম্মে ইমামা বানিন প্রতিটি পূজামণ্ডপে আইপি ক্যামেরা স্থাপন এবং ভিডিও ধারণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জেবল আইপি ক্যামেরা স্থাপন করে সেগুলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে সংযুক্ত করার ব্যবস্থাও নিতে বলেন।
তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয়পত্র ও বাহুবন্ধনী নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যাপ্তসংখ্যক নারী স্বেচ্ছাসেবক রাখার নির্দেশ দেন। পূজামণ্ডপে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, উসকানি, মাদক, ইভটিজিং, নারী ও শিশু হয়রানি কিংবা দুষ্কৃতকারীদের তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যদের যোগাযোগ নম্বর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সংরক্ষণ এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ সক্রিয় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন ইউএনও।
অগ্নিনিরাপত্তায় বিশেষ নির্দেশনা
অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে ইউএনও বলেন, প্রতিটি পূজামণ্ডপে কমপক্ষে পাঁচ কেজি ধারণক্ষমতার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, চার্জার লাইট ও প্রয়োজন অনুযায়ী জেনারেটর রাখতে হবে। বৈদ্যুতিক সংযোগে কোনো ত্রুটি রাখা যাবে না। পূজা শুরুর আগেই ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে মণ্ডপগুলোর বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনের নির্দেশ দেন তিনি।
প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নির্ধারিত স্থান ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, বিসর্জনস্থলে ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতি, আলোকসজ্জা, পরিচ্ছন্নতা, যানবাহন চলাচল ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিসর্জন কার্যক্রম শেষ করার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
গুজব প্রতিরোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আহ্বান
গুজব প্রতিরোধের বিষয়ে ইউএনও বলেন, কোনো তথ্য যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা যাবে না। গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে এর উৎস শনাক্ত করে আগেই প্রতিরোধ করতে হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে কেউ অপতৎপরতা চালালে দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এই চেতনাকে ধারণ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। আজান ও নামাজের সময় পূজামণ্ডপে মাইক ও বাদ্যযন্ত্রের শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্য ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।
পরিচ্ছন্নতা ও বিসর্জন-পরবর্তী কার্যক্রমে নির্দেশনা
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সতর্ক করে ইউএনও বলেন, পূজামণ্ডপ ও আশপাশে কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পূজা শেষে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পূজামণ্ডপ ঘিরে কোনো ধরনের মেলা, মাদক, জুয়া, হাউজি কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া হবে না।
তিনি আরও জানান, পূজার নিরাপত্তা প্রস্তুতি শুধু পূজার দিন থেকে নয়, মহালয়া থেকেই শুরু করতে হবে। ১৫ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিমা বিসর্জনের পর পূজামণ্ডপ, মন্দির বা আশপাশের কোনো স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন না করার নির্দেশনার কথাও জানান তিনি।
পূজা উদযাপন কমিটিগুলোকে প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে ইউএনও বলেন, কোনো ঘটনা ঘটার পর নয়, সম্ভাব্য সমস্যা বা ঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিলেই প্রশাসনকে জানাতে হবে। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও সম্প্রীতিময় দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি প্যারেড ব্রিফিংয়ের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
এমকে/বিডিমেইল২৪









