গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানার উৎপাদন বন্ধ

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানার উৎপাদন বন্ধ

সূত্রঃ সংগৃহীত

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি



হবিগঞ্জে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। গত ১৫ দিন ধরে চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস সরবরাহের পর বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে জেলার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিপাকে পড়েছেন লক্ষাধিক শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী।


শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাসের অভাবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন জানান, সেখানে ছয়টি কারখানা রয়েছে। টায়ার ও পাওয়ার প্ল্যান্ট ছাড়া অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানই শতভাগ রপ্তানিমুখী। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১২ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। শিল্পপার্কটির দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ কয়েক দিন ধরে মাত্র ৩ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার রাত ১২টার পর সেটিও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।


স্টার সিরামিক্সের প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা পল্লব জানান, তাদের কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার দুপুরের পর সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে উৎপাদন বন্ধ থাকার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।


এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে সাড়ে ১৩ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। বুধবার বিকেল পৌনে ৪টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদন হতো। বর্তমানে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।


হবিগঞ্জের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। এখন সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার কাজও থেমে গেছে। শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মস্থলে এলেও কাজ না থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে তাদের আয়-রোজগার ও সংসার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে।


হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। কয়েক দিন ধরে গ্যাস সংকট থাকলেও বুধবার সন্ধ্যা ৬টার পর সরবরাহ পুরোপুরি শূন্যে নেমে যায়। এতে শিল্পপার্কের সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।


স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ জানান, তাদের কারখানায় বুধবার বিকেল ৩টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ। এতে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।


সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। এসব কারখানার বড় একটি অংশ ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোও অচল হয়ে পড়েছে।


শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকেই হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট শুরু হয়। প্রথমদিকে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া গেলেও কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।


এদিকে, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, হবিগঞ্জের সব কারখানায় একইভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। কিছু প্রতিষ্ঠানে এখনও গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। ফলে একই এলাকার শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে এমন বৈষম্য কেন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।


জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকট বর্তমানে জাতীয় সমস্যা। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ সংকট শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে।



এমকে/বিএম২৪