গোলাপগঞ্জের সাত শহীদ: দুই বছর পরও স্বজনদের এক প্রশ্ন—বিচার কবে?
সূত্রঃ ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সিলেটের গোলাপগঞ্জের সাত শহীদ পরিবারের কাছে সময় যেন থেমে আছে ২০২৪ সালের সেই রক্তাক্ত আগস্টে। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া সাতজন আর কখনও ফিরে আসেননি। দীর্ঘ এই সময়েও বিচার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা। তাদের একটাই প্রশ্ন—বিচার কবে হবে?
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সিলেটের গোলাপগঞ্জে সংঘর্ষে প্রাণ হারান ছয়জন। পরদিন ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিনে সিলেট নগরের ক্বীন ব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন গোলাপগঞ্জের আরেক তরুণ। মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় সাতজনের প্রাণহানির ঘটনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে গোলাপগঞ্জ একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ে পরিণত হয়।
উত্তপ্ত সকাল, রক্তাক্ত বিকেল
৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-দক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সামনে থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি লঞ্চঘাট, বাজার ও ইউনিয়ন সড়ক হয়ে গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীর দিকে অগ্রসর হলে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ব্র্যাক অফিসসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে পুলিশ ও বিজিবি আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। স্থানীয় মসজিদগুলো থেকে মাইকিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিছিলটি ঢাকা দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছে পৌঁছালে আবারও গুলির ঘটনা ঘটে। এতে নিজ বাড়ির সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তাজ উদ্দিন ও নাজমুল ইসলাম। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান জয় আহমদ ও সানি আহমদ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শী ইমন বলেন, হঠাৎ করেই পুলিশ গুলি ছোড়ে। মুহূর্তেই চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে মানুষ ছোটাছুটি শুরু করে। রক্তাক্ত অবস্থায় কয়েকজনকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। সেই দিনের দৃশ্য আজও ভুলতে পারিনি।
চৌমুহনীতে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ
ঢাকা দক্ষিণে চারজন নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গোলাপগঞ্জ বাজার ও আশপাশে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। দুপুরে এমসি একাডেমি মাঠে কয়েক হাজার আন্দোলনকারী জড়ো হন। অন্যদিকে চৌমুহনী এলাকায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে।
বিকেলে আন্দোলনকারীদের বিশাল মিছিল চৌমুহনীতে পৌঁছালে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, থানার পাশ দিয়ে মিছিল যাওয়ার সময় পেছন দিক থেকে হামলা চালানো হয়। রামদা, লাঠিসোঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা চৌমুহনীর নিয়ন্ত্রণ নিলেও নিহত তাজ উদ্দিনের মরদেহ বহনকারী বিক্ষোভ মিছিল সেখানে পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। থানা ঘেরাওয়ের সময় আবারও গুলির ঘটনা ঘটে। এতে মিনহাজ আহমদ ও গৌছ উদ্দিন নিহত হন।
সেদিন নিহতরা হলেন—নাজমুল ইসলাম (২৪), জয় আহমদ (১৮), সানি আহমদ (২২), তাজ উদ্দিন (৩৯), মিনহাজ আহমদ (২৩) ও গৌছ উদ্দিন (৩৫)।
দুই দিনে সাত প্রাণহানি
৪ আগস্টের সংঘর্ষে গোলাপগঞ্জ ও ঢাকা দক্ষিণ এলাকায় প্রাণ হারান ছয়জন। পরদিন ৫ আগস্ট সিলেট নগরের ক্বীন ব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন গোলাপগঞ্জের পাবেল আহমদ কামরুল। দুই দিনের সহিংসতায় মোট সাতজনের মৃত্যু হয়, যা ওই সময়ের আন্দোলনের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে স্মরণ করা হয়।
স্বজনদের অপেক্ষা শুধু বিচারের
দুই বছর পরও শহীদ পরিবারের সদস্যরা বিচার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করছেন।
তাজ উদ্দিনের মা সুফিয়া বেগম বলেন, ছেলে আর ফিরে আসবে না। শুধু চাই, মৃত্যুর আগে তার হত্যার বিচার দেখে যেতে।
গৌছ উদ্দিনের ভাই আবুল কালাম বলেন, দুই বছরেও অপেক্ষার অবসান হয়নি। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচারই শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান।
শহীদ জয় আহমদের ভাই মনোয়ার হোসেন বলেন, এখনো মামলার চার্জশিট হয়নি। অনেক আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা প্রতিশোধ চাই না, শুধু সুষ্ঠু বিচার চাই। একই সঙ্গে সাত শহীদের স্মরণে গোলাপগঞ্জে একটি স্থায়ী স্মৃতিচত্বর নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
পাবেল আহমদ কামরুলের বড় ভাই পিপলু আহমদ বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত সব শহীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবছর প্রশাসনের উদ্যোগে কবর জিয়ারত ও স্মরণ কর্মসূচি পালন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারে।
তদন্ত এগোলেও চার্জশিটের অপেক্ষা
ঘটনার পর একাধিক মামলা হলেও তদন্তের ধীরগতিতে ক্ষোভ রয়েছে স্বজনদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পার হলেও বিচারিক প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
সিলেট জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক জানান, জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ঘটনায় জেলায় মোট ৩৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি হত্যা এবং ২৬টি অন্যান্য মামলা। হত্যা মামলার তিনটি তদন্ত করছে জেলা পুলিশ, আর বাকি আটটি তদন্ত করছে পিবিআই ও সিআইডি।
তিনি জানান, ২৬টি অন্যান্য মামলার মধ্যে ছয়টির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর তদন্তও চলমান। জেলা পুলিশের তদন্তাধীন তিনটি হত্যা মামলায় ৫৫ থেকে ১৫৫ জন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন। এছাড়া প্রতিটি মামলায় ১৫০ থেকে ২০০ জন অজ্ঞাত আসামিও রয়েছে।
পুলিশ সুপার বলেন, অধিকাংশ তদন্তই প্রায় শেষ পর্যায়ে। আশা করা হচ্ছে, আগামী দেড় মাসের মধ্যে হত্যা মামলাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হবে।
রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা
স্থানীয়দের দাবি, সাত শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণে গোলাপগঞ্জে একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্ম জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস জানতে পারে।
সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, ঘটনার পর একাধিক মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। সাতজন নিহত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মামলাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হলে বিচার আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, শহীদদের স্মরণে গোলাপগঞ্জে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি সাত শহীদের বাড়িতে যাওয়ার সড়ক তাদের নামে নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শহীদ পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, কবর জিয়ারত এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
এমকে/বিএম২৪









