জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন: নাহিদ ইসলাম
সূত্রঃ ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দীর্ঘ ১৬ বছরে বাংলাদেশ যে সংকট ও ধ্বংসের মুখে পড়েছে, সেখান থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। তবে দেশের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে থাকবে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) চ্যানেল ২৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও সংস্কার, বিচার ও পরিবর্তনের প্রত্যাশা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সংস্কার, বিচার এবং গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব বিপ্লবী চেতনায় পরিচালিত একটি সরকার প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সংবিধান বাতিল না করা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন না আনা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে। তার মতে, সেই সরকার চাইলে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারত।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক ঐকমত্যের আলোচনা বাস্তবে কার্যকর হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবর্তন আনার সক্ষমতা থাকলেও পরে নির্বাচিত সরকার সেই ঐকমত্য অনুসরণ করেনি। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকেই নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিচার ও সংস্কার বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সরকার কী অর্জন করেছে। তার দাবি, বাজেটে কিছু আর্থিক সহায়তা ছাড়া গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হয়নি এবং বিচার প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে রয়েছে।
বিএনপির প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, অতীতের বিভিন্ন গণঅভ্যুত্থানের সুবিধাভোগী হলেও দলটি সেই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর নেতিবাচক পরিণতিও তাদের ভোগ করতে হয়েছে।
তিনি জানান, এনসিপি সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা অব্যাহত রাখবে এবং সংস্কার বাস্তবায়নে জনমত গড়ে তুলবে। তবে দলটি আরেকটি গণঅভ্যুত্থান চায় না; বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষেই অবস্থান তাদের।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। চুক্তির বিতর্কিত বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে এর বিরোধিতা করার পক্ষে নয় এনসিপি। জাতীয় স্বার্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চীন সফর নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সফরটি ইতিবাচক হলেও দৃশ্যমান কোনো বড় অর্জন দেখা যায়নি। তিস্তা চুক্তি কিংবা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি। এছাড়া স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতাও নেই বলে দাবি করেন তিনি।
দলীয় পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি জানান, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এনসিপিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত করা, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জনই তাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হলে জোটের বাস্তবতাও বদলে যেতে পারে।
স্বাধীনতার বিরোধিতার দায় এনসিপির নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংস্কারের পক্ষে গড়ে ওঠা বৃহত্তর ঐক্যে বিভিন্ন দলের আদর্শে পার্থক্য থাকলেও পরিবর্তনের লক্ষ্য এক।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান ঘটিয়েছে, যা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এনসিপি আরও আগে শক্তিশালীভাবে সংগঠিত হতে পারলে দেশের জন্য আরও ইতিবাচক ফল আসতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১১-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও বরাদ্দের মধ্যেও এলাকার উন্নয়নে কাজ চলছে। বিরোধী দলের সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে বরাদ্দ পাওয়ায় নানা বাধা তৈরি হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন-অপূর্ণতা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে এখন সংস্কারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা জরুরি। সেই সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করাই এনসিপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লক্ষ্য।
এমকে/বিএম২৪









