কুড়িগ্রাম সদরে প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ
সূত্রঃ সংগৃহীত
শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের অন্তঃউপজেলা বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বদলি নীতিমালা উপেক্ষা করে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, শূন্য পদ না থাকা বিদ্যালয়ে বদলি, আবেদন না করা শিক্ষককে তালিকাভুক্ত করা এবং আবেদনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ করেছেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দ।
তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এসব অনিয়ম করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র ও প্রকাশিত আদেশ পর্যালোচনায় দেখা যায়, সদর উপজেলার ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদের বিপরীতে ৪৩ জন শিক্ষক বদলির জন্য আবেদন করেন। আবেদন গ্রহণের শেষ সময় ছিল ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেলে ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’ ১২ জন শিক্ষককে বদলির আদেশ দেয়।
তবে প্রকাশিত বদলি তালিকা বিশ্লেষণ করে অন্তত আটজনের ক্ষেত্রে বদলি নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ
বদলি তালিকায় জ্যেষ্ঠতার বিষয়টিও উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নথি অনুযায়ী, তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাশিরুল মুমিন খন্দকারকে দুইজনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে, তৃতীয় স্থানে থাকা রোখসানা পারভীনকে তিনজনের, চতুর্থ স্থানে থাকা পাপড়ী রানীকে ছয়জনের এবং অষ্টম স্থানে থাকা ফরিদা বেগমকে সর্বোচ্চ ১০ জনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এ ছাড়া বদলি নীতিমালা অনুযায়ী, পাঁচ বা তার কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত থাকা বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি না করার নির্দেশনা থাকলেও কয়েকটি বদলির ক্ষেত্রে সেই নির্দেশনাও উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আবেদন না করেও বদলি
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে মাহমুদা আক্তারের বদলি নিয়ে। প্রকাশিত ৪৩ জন আবেদনকারীর তালিকায় তাঁর নাম নেই। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি বদলির আবেদন করেননি বলে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তালিকা থেকে জানা যায়। অথচ চূড়ান্ত বদলি আদেশে ১২ নম্বর ক্রমিকে তাঁর নাম রয়েছে।
এ ঘটনায় আবেদনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর তালিকা পরিবর্তন করে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক নেতারা।
শূন্য পদ না থাকা বিদ্যালয়ে বদলি
তালিকার ১০ নম্বরে থাকা শিক্ষক আব্দুর রহিমকে পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। তবে শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত শূন্য পদের তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম ছিল না। এমনকি আব্দুর রহিমের বদলির পছন্দক্রমেও বিদ্যালয়টির নাম উল্লেখ ছিল না বলে নথিপত্রে দেখা গেছে।
এতে বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নীতিমালা অনুসরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যোগদানের সাল নিয়েও প্রশ্ন
বদলি তালিকায় থাকা মনিরা আক্তারের চাকরি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা হলেও তাঁকে ২০১০ সালে যোগদান দেখিয়ে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে যোগদানের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি নিয়েও শিক্ষক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ
উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে সদর উপজেলার সরকারদলীয় এক প্রভাবশালী নেতা ও প্রাথমিক শিক্ষক সমাজের এক নেতার সঙ্গে কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলা শিক্ষা অফিসে যান। সেখানে শিক্ষা কর্মকর্তার ওপর চাপ প্রয়োগ করে বদলি তালিকায় পরিবর্তন আনা হয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ওই ব্যক্তিরা। তাদের দাবি, তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও শিক্ষা কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানাতে অফিসে গিয়েছিলেন। সেখানে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়নি।
চাপের কথা স্বীকার শিক্ষা কর্মকর্তার
বদলি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “আমি অসহায়। বাধ্য হয়েছি। যেগুলো অভিযোগ তুলেছেন, তা আমি অস্বীকার করছি না। আমাকে তালিকা দিয়ে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে। আমি স্বাক্ষর করেছি। কে বা কারা চাপ দিয়েছে, তা আমি বলতে পারব না।”
তিনি আরও বলেন, “অল্প কিছুদিন হলো আমি এখানে যোগদান করেছি। শিক্ষকদের ভালো করে চিনি না। টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি চেয়েছি নীতিমালা অনুযায়ী হোক, শিক্ষকরা ন্যায্য সুবিধা পাক। কিন্তু এখানকার সব খবর আপনারা জানেন। চাপ ও দুর্নামের বোঝা নিতে পারছি না। আমি চাই এই বদলি আদেশ বাতিল হোক।”
তদন্তের দাবি শিক্ষক নেতাদের
শিক্ষক নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি বদলি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছেন। তাদের দাবি, আর্থিক লেনদেন ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে প্রকৃত দাবিদার অনেক শিক্ষককে বঞ্চিত করে পছন্দের শিক্ষকদের বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তারা অভিযোগগুলো তদন্ত করে নীতিমালা অনুযায়ী নতুন করে বদলি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন।
ইউএনও বললেন, অনিয়ম হলে আদেশ বাতিল
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, “তেমন রাজনৈতিক চাপ নয়, কিছু সুপারিশ ছিল। বড় ধরনের কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে বদলি আদেশ বাতিল করা হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, বদলি প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা, শূন্য পদ, আবেদনকারীর পছন্দক্রম এবং নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা আরও স্পষ্ট হবে। এখন চূড়ান্ত বদলি আদেশ বহাল থাকবে, নাকি পুনর্বিবেচনা করা হবে, সেটিই দেখার বিষয়।
এমকে/বিএম২৪









