পটাসিয়াম ক্লোরাইড
সূত্রঃ ছবি: বিডিমেইল
পর্ব-১
কলমে: অনিকেত
...২০০৯ সাল! নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আমি তখন সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছি। ভর্তির ডেইটও পড়ে গেছে। এদিকে, নব প্রাপ্তির আনন্দে আমি যেন সুখের সপ্ত আসমানে ডানা মেলে উড়ছি!
সেদিন ছিল শনিবার। আমি সার্কিট হাউস পাড়ায় সেজো খালাদের বাড়িতে গেছি বেড়াতে। কোন রকম পূর্ব সিগন্যাল ছাড়াই হঠাৎ করে আমার লোয়ার এমডমে প্রচণ্ড পেইন শুরু হলো! সেইসাথে, বার্নিং স্যানসেশন! বারবার ইউরিন পাস্ হচ্ছে। ওহ! সে এক অসহ্য যন্ত্রণা। এদিকে হুট করেই ইউরিনের সাথে একচাপ রক্তদলা চোখে পড়তেই আঁতকে উঠলাম! ঘাবড়ে গিয়ে তৎক্ষনাৎ, বড় ভাইকে ফোন দিলাম। বড় ভাই তখন শিক্ষানবিশ পিরিয়ড শেষে পুরোদস্তুর একজন ইউরোলজিস্ট। ঢাকা পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে চেম্বার করেন।
সবকিছু শুনে তিনি আমাকে কোনরকম দেরি না করে, হাসপাতালে ভর্তি হতে বললেন। এদিকে, ভর্তির ডেইট একদম দোরগোড়ায়!
বাবাকে ফোন দিতেই তিনি মাকে সাথে নিয়ে ছুটে আসলেন। জেলা শহর থেকে সামান্য দূরে আমাদের গ্রামের বাড়ি। হাসপাতালে ভর্তি করা হলো আমাকে! ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঢাকাতে রেফার্ড করলেন। দেরি না করেই বাবা অফিস থেকে এমারজেন্সি লিভ নিয়ে আমাকে সাথে করে ঢাকার দিকে ছুটলেন!
সেই প্রথম আমার শরীরে অস্ত্রোপচার করা হলো! অপারেশন থিয়েটার এবং মেডিকেল ইনস্ট্রুমেন্টস্ সচক্ষে দেখারও প্রথম সেই মুহুর্ত!
থাক! সে গল্প আরেকদিন বলা যাবে। আমি অনিকেত। অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে। ছোট্ট একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে আমি একজন দক্ষ ডাক্তার হবো! কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এবং পিতার অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে আমার সেই অধরা স্বপ্ন আর আলোর মুখ দেখেনি!
অপারেশনের সাত দিনের মাথায় ফিক্সড ক্যাথেটার নিয়ে আমাকে হাসপাতাল ছাড়তে হলো! বাবাও ফিরে আসলেন তার চিরচেনা কর্মস্থলে! আর আমার দিনগুলো কাটলো ফিক্সড্ ক্যাথেটারের অসহ্য বেদনায়! ভর্তির কাজগুলো ঠিক এভাবেই শেষ হয়ে গেল!
ভর্তি শেষ। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বিত একজন সদস্য! নিয়মিত ক্লাস, খেলাধূলা, বন্ধুদের সাথে ক্যাম্পাস আড্ডা! তখন এই ছিল আমার নিত্যদিনের কাজ। পরবর্তীতে, নিছক ঘটনায় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল, ভলিবল এবং ক্রিকেট টিমের একজন নিয়মিত সদস্য হয়ে গেলাম! সে এক রোমাঞ্চকর মুহুর্ত!
এদিকে, ক্যাম্পাস জীবনের শুরুতেই কোন এক গভীর নিশীথে জুয়েল ভাইয়ের হাত ধরে তৎকালীন বিরোধী দলের রাজনীতিতেও নাম লেখালাম!
কী আর করা! নিয়তির নির্মম ফেরায় পড়ে একদিন গভীর রাতে শূন্য হাতে হলটাও ছাড়তে হলো!
হল ছেড়ে নিরুপায় হয়ে পলাশিতে ঘুরছি। ঢাকা শহরে কে আমাকে আশ্রয় দেবে! কোথায় যাবো! এ যেন "কোথাও কেউ নেই" সিচুয়েশন!
এদিকে, জুয়েল ভাইও গ্রামের বাড়িতে। রাত আরও গভীর হলো। আমি তখন ফুলার রোডে বসে নিকোটিনে দুঃখ ভুলছি মাত্র! হঠাৎ, রিকশা থেকে কে যেন নাম ধরে ডাকলো! ফিরে তাকাতেই দেখি, ঢাকা মেডিকেলের সুমন ভাই!
দৌঁড়ে গেলাম ভাইয়ের কাছে। ভাই, আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, "কী রে পাগলা, কী হয়েছে? এতরাতে একা বসে আছিস কেন?"
আমি বললাম,
ভাই, ওরা আমাকে হল থেকে বের করে দিয়েছে।
ভাই, একগাল হেসে বললেন,
"বোকা ছেলে। ওঠ্ রিকশায়। আমার হলে চল। আমি তো হলে থাকি না ঠিক মতো। তুই থাকবি এখন থেকে।"
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা যেন আমার সমস্ত কষ্ট এক নিমেষে দূর করে দিলেন! ভাইকে শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম। ভাইও আমাকে বাহুডোরে আগলে নিলেন।
সেদিনের পর থেকে আমি ঢাকা মেডিকেলের ডা: ফজলে রাব্বি হলের ৩১১-নং রুমে থাকি।
এদিকে, খুব সাবধানে চলে ক্যাম্পাসে যাতায়াত! সামনে ৬ষ্ঠ সেমিস্টার ফাইনাল এক্সাম! দিনগুলো ভালোই চলছিল! কিন্তু, বিধি হলেন বাম! একদিন রাতে হুট করেই আবারও সেই পুরনো ব্যাথা! লোয়ার অ্যাবডম টনটন করছে! আবারও বার্নিং স্যানসেশন! অনিকেত মনে পুনরায় জেগে ওঠা বীভৎস সেই অপারেশন থিয়েটারে জ্বলে ওঠা হ্যাচাগ্ লাইট!
আমি শুধু ছটফট করছি। রাতও গভীর হচ্ছে! নিরুপায় হয়ে সুমন ভাইকে ফোন দিলাম। ভাইয়ের তখন ইন্টার্নশিপ্ ডিউটি চলে। কথা না বাড়িয়েই বললেন, "একটু কষ্ট কর। আমি এক্ষুণি চলে আসছি।"
এদিকে আমি ব্যাথায় ছটফট্ করছি! ভাই আসলেন। আমার কপালে হাত দিয়ে বললেন,
"ডোন্ট ওরি। শুয়ে পড়তো দেখি।"
ভাই, আমার লোয়ার অ্যাবডমে হাত দিয়েই বললেন, "ইমারজেন্সি ক্যাথেটার করতে হবে। আচ্ছা, তোর কি আগেও এমন হইছিলো নাকি?"
আমি বললাম, ভাই, আমার একটা সার্জারি আছে।
ভাই বললেন, "বলিস কী?....অপারেশন ফাইল কোথায়?"
আমি বললাম, ভাই, সব তো হলে ফেলে এসেছি।
সুমন ভাই তখন তড়িঘড়ি করে টেবিল থেকে একটা ছুরি কাঁচির ছবি সাটানো একটা বই হাতে নিয়ে ঘাটতে শুরু করলেন!
একটা ছবি বের করে আমার সামনে ধরতেই আঁতকে উঠলাম!
ভাই বললেন, "দেখতো এটা নাকি?"
আমি বললাম, ভাই আমি তো অপারেশনের সময় জেগেই ছিলাম। এটাই ভাই।
সুমন ভাই আর দেরি না করে আমাকে আশ্বস্ত করেই জেসোকেইন্ জেলির টিউবটি ওপেন করলেন। শুধু বললেন, "ডোন্ট ওরি।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, আবারও শরীরে কিছু একটা ঢোকানো হলো! নিলাটোন্ ক্যাথেটার!
আস্তে-আস্তে আমার লোয়ার অ্যাবডমও হালকা হওয়া শুরু করলো! পরবর্তীতে, আবারও শুরু হলো পুরনো সেই মেডিকেইশন!
আমি এখন মোটামুটি সুস্থ। সুমন ভাই গ্রামের বাড়িতে থাকায়, পুরো রুমটাই যেন শূন্য-শূন্য লাগছে! রুমে থাকা বাকিরাও কেউ নেই! আমি অবচেতন মনেই হাত বাড়িয়ে দিলাম ভাইয়ের পড়ার টেবিলে ঝলমল করা সেই লোভনীয় বইটির দিকে।
আহা! কত সুন্দর করে প্রতিটা পার্টে মেডিকেল সাইন্সের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ! আমিও গভীর মনোযোগে একের পর এক পাতা উল্টে যাচ্ছি।
এদিকে, হুট করেই চোখের সামনে লাল কালির মোটা দাগে লেখা একটি শব্দযুগলে চোখ আটকে গেল! চোখের সামনে ভেসে উঠলো একটি দারুণ আর্টিকেল....
"The power & magic of Potassium Chloride"
....!!! (চলবে)








