বয়স কি অপরাধ?
সূত্রঃ ফাইল ছবি
যোগ্যতার আগে জন্মতারিখ কেন? চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণায় বয়সের অদৃশ্য দেয়াল
চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে আজকাল অনেকের কাছেই একটি প্রশ্ন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—
“আপনার বয়স কত?”
প্রশ্নটি স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন একজন মানুষের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও কর্মক্ষমতার চেয়ে তার জন্মতারিখ বড় হয়ে ওঠে।
বয়স একটু বেশি হলেই যেন অদৃশ্য একটি দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
ডিগ্রি আছে—কিন্তু বয়স বেশি।
অভিজ্ঞতা আছে—কিন্তু বয়স বেশি।
দক্ষতা আছে—কিন্তু বয়স বেশি।
কাজ করার মানসিকতা ও সক্ষমতা আছে—তবুও বয়স বেশি!
তাহলে কি বয়স হওয়াটাই অপরাধ?
মানুষ কি ৪৫ বছর পার করলেই অযোগ্য হয়ে যায়? ৫০ বছর হলেই কি তার মেধা শেষ? ৫৫ বছর হলেই কি তার অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানের জন্য বোঝা? আর ৬০ বছর হলেই কি তার কর্মক্ষমতার ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালা পড়ে যায়?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের চাকরির বাজারে বয়সকে এত বড় মাপকাঠি বানানোর যৌক্তিকতা কোথায়?
---
শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়—সমস্যাটি সর্বত্র
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও প্রকট। অনেক প্রতিষ্ঠান ৪৫, ৫০ বা ৫৫ বছর পার হওয়া কর্মীকে ধীরে ধীরে ‘পুরোনো’ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
অভিজ্ঞ কর্মীর বেতন তুলনামূলক বেশি—তাই তাকে বাদ দিয়ে কম বেতনে তরুণ কর্মী নিয়োগের প্রবণতাও দেখা যায়।
তরুণদের সুযোগ দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
তরুণদের সুযোগ দিতে গিয়ে অভিজ্ঞদের কি ছুড়ে ফেলে দিতে হবে?
একই প্রশ্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
বিশেষ করে শিক্ষকতা ও গবেষণার মতো পেশায় অভিজ্ঞতার মূল্য কি অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে কম?
বরং একজন শিক্ষক যত বেশি পড়ান, যত বেশি গবেষণা করেন, যত বেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকের সঙ্গে কাজ করেন, তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার তত সমৃদ্ধ হতে পারে।
একজন ২৫ বছরের শিক্ষক হয়তো মেধাবী ও উদ্যমী।
কিন্তু একজন ৫৫ বা ৬০ বছরের শিক্ষক তার সঙ্গে নিয়ে আসেন কয়েক দশকের—
শিক্ষাদান অভিজ্ঞতা, গবেষণা অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, একাডেমিক নেতৃত্ব এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পথ দেখানোর অভিজ্ঞতা।
তাহলে শুধু বয়সের কারণে সেই অভিজ্ঞতাকে অপ্রয়োজনীয় বলে দেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত?
---
বিশ্ববিদ্যালয়ে কি বয়সই সব?
বিশ্বের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের ক্ষেত্রে একসময় ৭০ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক অবসরের নিয়ম ছিল। কিন্তু ফেডারেল Age Discrimination in Employment Act-এর প্রয়োগ উচ্চশিক্ষায় বিস্তৃত হওয়ার পর সেই বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান ১৯৯৩ সালে বিলুপ্ত হয়। OECD-এর একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর পর একটি বড় গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক ৭০ বছরের পরও কর্মরত থাকার সম্ভাবনা দেখা যায়।
অর্থাৎ বিশ্বের একটি বড় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু “বয়স কত?”—এখানে থেমে থাকেনি।
বরং প্রশ্ন হয়েছে—
“তিনি কাজ করতে পারছেন কি না?”
এখানেই আমাদের জন্য বড় শিক্ষা আছে।
---
যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ: বয়স নিয়ে আইন পর্যন্ত আছে
যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মী ও চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে বয়সের ভিত্তিতে বৈষম্য রোধে Age Discrimination in Employment Act (ADEA) রয়েছে।
এই আইনের আওতায় নিয়োগ, চাকরিচ্যুতি, পদোন্নতি, বেতন, প্রশিক্ষণসহ চাকরির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বয়সের কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধ। এমনকি চাকরির বিজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট বয়সের পছন্দ বা সীমাবদ্ধতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও কঠোর বিধান রয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের আইনের পটভূমিতে কংগ্রেস স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছিল যে কাজ করার সম্ভাব্য সক্ষমতা বিবেচনা না করে নির্বিচারে বয়সসীমা নির্ধারণ করা বয়স্ক কর্মীদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ সেখানে আলোচনাটি শুধু “বয়স্ক মানুষকে চাকরি দিতে হবে”—এমন সরল বিষয় নয়।
মূল প্রশ্ন হলো—
বয়সের কারণে একজন যোগ্য মানুষকে অযৌক্তিকভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে কি না।
---
যুক্তরাজ্যেও বয়স সুরক্ষিত বৈশিষ্ট্য
যুক্তরাজ্যে Equality Act 2010-এর অধীনে কর্মক্ষেত্রে বয়স একটি protected characteristic। চাকরিপ্রার্থী ও কর্মীদের ক্ষেত্রে বয়সের ভিত্তিতে বৈষম্য, হয়রানি ও অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে আইনগত সুরক্ষা রয়েছে।
অর্থাৎ উন্নত দেশগুলো বয়সের বিষয়টিকে একেবারে অস্বীকার করে না। সেখানে অবসর, পেনশন ও নির্দিষ্ট পেশার বয়সসীমা থাকতে পারে।
কিন্তু একই সঙ্গে তারা এটিও স্বীকার করে—
বয়সের কারণে মানুষকে অন্যায়ভাবে মূল্যহীন করে দেওয়া উচিত নয়।
---
জাপানের উদাহরণ আরও শিক্ষণীয়
জাপানও বয়স্ক জনগোষ্ঠী ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতা বিবেচনা করে বয়স্ক কর্মীদের কর্মসংস্থান ধরে রাখার ব্যবস্থা করেছে।
জাপানের আইনে নিয়োগকর্তা নির্ধারিত অবসরের বয়স ৬০ বছরের নিচে রাখতে পারেন না; আর ৬৫ বছরের নিচে অবসরের বয়স নির্ধারণ করলে কর্মীর ৬৫ বছর পর্যন্ত স্থিতিশীল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ সেখানে বার্তা হলো—
৬০ বছর মানেই মানুষ শেষ—এমন নয়।
বরং কর্মক্ষম মানুষের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে আরও কাজে লাগানো যায়, সেটিও রাষ্ট্রের বিবেচনার বিষয়।
---
গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বয়সের মূল্য আরও বেশি
গবেষণার জগতে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
গবেষণার কোনো বয়স নেই।
একজন গবেষক ৩০ বছর বয়সে নতুন ধারণা দিতে পারেন।
আবার ৬০ বছর বয়সে তার কয়েক দশকের গবেষণা অভিজ্ঞতা একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্মের গবেষককে পথ দেখাতে পারে।
OECD-এর উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, একাডেমিক কর্মীদের ক্ষেত্রে নীতির লক্ষ্য শুধু কর্মীদের বয়সের দিকে তাকানো নয়; বরং তাদের human capital বা জ্ঞান ও দক্ষতার দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে গবেষণায় সৃজনশীলতা শুধু তরুণ বয়সের বিষয়—এমন সরল ধারণারও সমর্থন নেই; বিভিন্ন মানুষের সৃজনশীলতার সময়কাল ভিন্ন হতে পারে।
তাহলে গবেষণা প্রতিষ্ঠানে একজন ৫৫ বা ৬০ বছরের গবেষককে শুধু বয়সের কারণে অবমূল্যায়ন করার যুক্তি কোথায়?
---
তাহলে কি অবসরের প্রয়োজন নেই?
অবশ্যই আছে।
একটি প্রতিষ্ঠানে প্রজন্মের পরিবর্তন দরকার। তরুণদের সুযোগ দরকার। পদোন্নতির পথ দরকার। অবসর ও পেনশন ব্যবস্থারও প্রয়োজন আছে।
কিন্তু অবসর নীতি আর বয়সের ভিত্তিতে মানুষকে অযোগ্য ঘোষণা—দুটি এক জিনিস নয়।
যেখানে নির্দিষ্ট অবসর বয়স আইন বা প্রতিষ্ঠানের নীতিতে আছে, সেটি একটি পৃথক বিষয়।
কিন্তু যেখানে একজন মানুষকে নতুন চাকরিতে আবেদন করার সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না শুধু তার বয়স ৪৫, ৫০ বা ৫৫ বলে—সেখানে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
কারণ অবসর নেওয়া আর কর্মক্ষমতা হারানো এক কথা নয়।
---
সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতা কোথায়?
একজন ৭০ বছরের প্রতিষ্ঠানের মালিক ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
৭০ বছরের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোটি টাকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
৭০ বছরের একজন অধ্যাপক জ্ঞান দিতে পারেন।
৬০–৭০ বছরের একজন গবেষক নতুন গবেষণার নেতৃত্ব দিতে পারেন।
কিন্তু ৫০ বছর বয়সী একজন চাকরিপ্রার্থীকে বলা হবে—
“আপনার বয়স হয়ে গেছে!”
এ কেমন হিসাব?
শীর্ষ পদে বয়স যদি অভিজ্ঞতা হয়, নিচের পদে সেই একই বয়স কেন অযোগ্যতা?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের চাকরির বাজারকে দিতেই হবে।
---
তরুণ বনাম প্রবীণ নয়—প্রয়োজন তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—
তরুণরা প্রতিষ্ঠানের শক্তি, আর অভিজ্ঞরা প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি ও দিকনির্দেশনা।
তরুণ কর্মী প্রযুক্তিতে দ্রুত হতে পারেন।
অভিজ্ঞ কর্মী হয়তো সংকট মোকাবিলায় বেশি পারদর্শী।
তরুণ নতুন পদ্ধতি নিয়ে আসতে পারেন।
অভিজ্ঞ বলতে পারেন—আগে কোথায় ভুল হয়েছিল।
তরুণ গতি দিতে পারেন।
অভিজ্ঞ দিতে পারেন দিকনির্দেশনা।
একজনকে আরেকজনের প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে নয়—দুজনকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়েই একটি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হতে পারে।
---
বয়স নয়, সক্ষমতার পরীক্ষা হোক
চাকরির ইন্টারভিউতে প্রশ্ন হওয়া উচিত—
আপনার দক্ষতা কী?
আপনার অভিজ্ঞতা কী?
আপনি কী ধরনের সমস্যার সমাধান করেছেন?
আপনি প্রতিষ্ঠানের জন্য কী মূল্য তৈরি করতে পারবেন?
আপনার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা কতটুকু?
আপনি নতুন প্রযুক্তি শিখতে পারবেন কি না?
এই প্রশ্নগুলো করুন।
প্রয়োজনে দক্ষতার পরীক্ষা নিন।
প্রয়োজনে লিখিত পরীক্ষা নিন।
প্রয়োজনে তিন মাসের probation দিন।
কিন্তু শুধু জন্মতারিখ দেখে মানুষকে বাতিল করবেন না।
কারণ—
বয়স কাগজে লেখা একটি সংখ্যা;
যোগ্যতা প্রমাণ হয় কাজে।
---
শেষ কথা
আমাদের সমাজে এমন একটা ধারণা যেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে—
“৪৫ পার? চাকরি কঠিন।”
“৫০ পার? আপনি শেষ।”
“৫৫ পার? আপনাকে আর দরকার নেই।”
এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।
একজন মানুষের জীবনের ২০–৩০ বছরের কর্মঅভিজ্ঞতাকে শুধু একটি জন্মতারিখ দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
একজন কর্মক্ষম মানুষকে তার বয়সের কারণে দরজা থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার আগে অন্তত একবার জিজ্ঞেস করা উচিত—
“তিনি কাজটি করতে পারবেন কি না?”
কারণ—
মানুষের বয়স বাড়ে, কিন্তু তার মূল্য সবসময় কমে না।
কখনো কখনো বয়সের সঙ্গে শরীরের গতি কিছুটা কমে, কিন্তু সিদ্ধান্তের গভীরতা বাড়ে।
কখনো হাতের গতি কমে, কিন্তু অভিজ্ঞতার গতি বাড়ে।
কখনো তরুণের শক্তি কম নয়—কিন্তু অভিজ্ঞ মানুষের ভুল থেকে শেখা জ্ঞানও কম নয়।
তাই চাকরি, শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই নীতিটি হওয়া উচিত—
**“বয়সকে নয়, যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করুন।
তারুণ্যকে সুযোগ দিন, কিন্তু অভিজ্ঞতাকে অপমান করবেন না।”**
বয়স কোনো অপরাধ নয়।
অভিজ্ঞতা কোনো বোঝা নয়।
কর্মক্ষম মানুষকে শুধু জন্মতারিখের কারণে অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত নয়।
মানুষকে তার জন্মসনদ দিয়ে নয়—তার কর্ম দিয়ে বিচার করুন।তথ্যসূত্রের ভিত্তি: যুক্তরাষ্ট্রের EEOC, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ, OECD, যুক্তরাজ্যের Acas/GOV.UK এবং জাপানের সরকারি আইনভিত্তিক উৎস। উপরের আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো তাই শুধু আবেগের বক্তব্য নয়; সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন ও নীতির বাস্তব উদাহরণও এর সঙ্গে যুক্ত আছে।
লেখক
এ বি জিয়াউদ্দিন হোসেন
সিনিয়র সাংবাদিক









