চট্টগ্রামের ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনা: এবার মত দেবেন নগরবাসী
সূত্রঃ ফাইল ছবি
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম আগামী ২৫ বছরে কোন পথে এগোবে? কোথায় গড়ে উঠবে নতুন নগরকেন্দ্র, কীভাবে কমবে জলাবদ্ধতা ও যানজট, কোন পাহাড় ও জলাশয় সংরক্ষিত থাকবে, আর কোন এলাকায় হবে নতুন সড়ক ও আবাসন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫–২০৫০)–এর খসড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন। এবার সেই পরিকল্পনা নিয়ে সরাসরি মতামত দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন নগরবাসী।
আগামী ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিনব্যাপী জনমত গ্রহণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। এই সময়ের মধ্যে নাগরিকেরা পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে মতামত, আপত্তি, সুপারিশ ও সংশোধনী প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন।
শনিবার (১ আগস্ট) চউক ভবনের হলরুমে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন।
২৫ বছরের পরিকল্পনা, ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা
চউক সূত্রে জানা যায়, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপ বহন করছে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট, যানজট, জলাবদ্ধতা, আবাসন সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই বাস্তবতায় ২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত সময়কে সামনে রেখে ২৫ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় চউক। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যা সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বর্তমানে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৮৭ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৫৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
এই পরিকল্পনার আওতায় শুধু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নয়, আশপাশের নগরায়ণশীল এলাকা মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান শহরের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেসব এলাকায় নগর সম্প্রসারণ ঘটবে, সেগুলোকেও পরিকল্পনার মধ্যে আনা হয়েছে।
শুধু শহর নয়, বদলে যেতে পারে পুরো মহানগর
খসড়া পরিকল্পনায় মূল শহরের ওপর চাপ কমাতে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ ধারণা সামনে আনা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন নগরকেন্দ্র গড়ে তোলা, নতুন সড়ক নির্মাণ, বিদ্যমান সড়ক প্রশস্তকরণ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নতুন খাল খনন, পাহাড় ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং আনোয়ারা, বাকলিয়া–চর বাকলিয়া ও আগ্রাবাদের জন্য পৃথক অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভূমি উন্নয়নে টিডিআর (Transfer of Development Rights), ট্রাইপার্টাইট মডেল, গাইডেড ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এবং ল্যান্ড রিডজাস্টমেন্ট–এর মতো আধুনিক পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।
চউকের কর্মকর্তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সেবার মানও উন্নত হবে।
পরিকল্পনা কি বাস্তবায়ন হবে?
চট্টগ্রামে মাস্টারপ্ল্যান নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তার অনেক অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নতুন এই পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের প্রশ্নে অনেকের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন করলেই হবে না; বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সমন্বিত উদ্যোগ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়।
চট্টগ্রামে একই এলাকায় সিটি করপোরেশন, চউক, ওয়াসা, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসনসহ একাধিক সংস্থা কাজ করে। সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিন ধরেই নগর উন্নয়নের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত।
কেন গুরুত্বপূর্ণ জনমত?
প্রেস ব্রিফিংয়ে চউক চেয়ারম্যান বলেন, একটি মাস্টারপ্ল্যান কেবল পরিকল্পনাবিদদের তৈরি নথি হতে পারে না। বাস্তব সমস্যার সবচেয়ে নির্ভুল চিত্র জানেন স্থানীয় বাসিন্দারাই।
কোন এলাকায় বর্ষায় পানি জমে, কোথায় প্রতিদিন যানজট হয়, কোন খাল বা জলাশয় সংরক্ষণ প্রয়োজন, কোথায় নতুন বিদ্যালয়, হাসপাতাল, খেলার মাঠ কিংবা গণপরিবহনের প্রয়োজন—এসব তথ্য জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া পূর্ণাঙ্গভাবে জানা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, জনমত গ্রহণকে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং পরিকল্পনাকে আরও বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নাগরিকদের যৌক্তিক মতামত যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে চূড়ান্ত মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
যেভাবে মতামত দেওয়া যাবে
আগামী ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চউক ভবনের চতুর্থ তলার হলরুমে খসড়া মাস্টারপ্ল্যানের প্রতিবেদন ও মানচিত্র সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সেখানে নির্ধারিত ফরমে লিখিত মতামত, আপত্তি বা সংশোধনী জমা দেওয়া যাবে।
এ ছাড়া যারা সরাসরি যেতে পারবেন না, তারা চউকের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনেও মতামত দিতে পারবেন।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান
প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে চউক চেয়ারম্যান বলেন, নাগরিকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় পরিকল্পনা দেখা যাবে, কীভাবে মতামত দেওয়া যাবে এবং অনলাইন পদ্ধতিতে কীভাবে অংশগ্রহণ করা যাবে—এসব তথ্য প্রচারের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার বাস্তব সমস্যা ও জনগণের গঠনমূলক প্রস্তাবও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে উঠে আসা প্রয়োজন।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা যতই আধুনিক হোক, বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। পাহাড় ও জলাশয় রক্ষা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
তবে নাগরিকদের প্রত্যাশা, এবার যেন মাস্টারপ্ল্যান কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব উন্নয়নের পথনকশা হয়ে ওঠে।
আগামী দুই মাসে জনমত গ্রহণ শেষে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে চূড়ান্ত মহাপরিকল্পনা অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ









