মাতারবাড়ী বন্দর দিয়ে ‘সেভেন সিস্টার্স’কে বঙ্গোপসাগরে যুক্ত করতে চায় জাপান
সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চট্টগ্রামের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা করছে জাপান। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে—‘সেভেন সিস্টার্স’—বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে চায় টোকিও।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু টোকিওভিত্তিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। সফরে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে জাপানের সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়া ২০৩১ সাল পর্যন্ত মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলার বিভিন্ন প্রকল্পে জাপানি অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক প্রতিনিধি *দ্য হিন্দু*কে জানিয়েছেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশকে আঞ্চলিক শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ট্রানজিট ব্যবস্থায় নতুন গতি আনতে সক্ষম।
ব্যাংককের উন্নয়ন মডেল অনুসরণের পরিকল্পনা
জাপানি কূটনীতিকদের পরিকল্পনায় মাতারবাড়ীকে ঘিরে একটি বিশেষ শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগব্যবস্থা বা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন’ গড়ে তোলার বিষয়টি রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের সঙ্গে সড়ক ও বাণিজ্যিক সংযোগ জোরদার করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের ব্যাংকককে একটি অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে দেখছে জাপান। দেশটির অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনার সহায়তায় থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মধ্যে গড়ে ওঠা উন্নয়ন করিডোরকে সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন জাপানি কর্মকর্তারা।
দ্য হিন্দুকে দেওয়া লিখিত জবাবে জাপানের এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকক তার বন্দরগুলো এবং ‘সাউদার্ন ইকোনমিক করিডোর’ কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিয়েছে। মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ মাতারবাড়ী
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে বড় আকারের পণ্যবাহী জাহাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে। বর্তমানে বড় জাহাজে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত আগস্টে মাতারবাড়ী পরিদর্শন করে প্রকল্পের অগ্রগতি ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত হন। জাপানের সহায়তায় বন্দরটির পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রভাব
মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জাপানি কূটনীতিকরা। অতীতে দুই দেশের সম্পর্ক ভালো থাকায় যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া সহজ হয়েছিল বলে *দ্য হিন্দু*র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ফেনী নদীর ওপর নির্মিত হয় মৈত্রী সেতু। সেতুটি ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। এর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মাতারবাড়ী বন্দরের সংযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় সেতুটির ব্যবহার ও যোগাযোগ পরিকল্পনা প্রত্যাশিত গতি পায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ, ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে মাতারবাড়ী বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে আশা করছে জাপান। দেশটির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু সমুদ্রবাণিজ্যের কেন্দ্রই নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
সূত্র: দ্য হিন্দু
এমকে/বিএম২৪









