আসাদুজ্জামানের যে ভয়ঙ্কর রূপের কথা কেউ জানে না

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:২২ এএম
আসাদুজ্জামানের যে ভয়ঙ্কর রূপের কথা কেউ জানে না

সূত্রঃ ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক


নীলফামারীর সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের রাজনৈতিক সময়কাল নিয়ে স্থানীয়দের বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নীলফামারী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য থাকার সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা, গ্রেপ্তার ও হামলার নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ওঠে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৯৬ সাল থেকে জেলার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর আসাদুজ্জামান নূর ও তার অনুসারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে বিরোধী দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য বা সংশ্লিষ্ট নথির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই।


নীলফামারীর শান্ত সবুজ মাঠ আর তিস্তা নদীর তীরের মানুষরা একসময় শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করত। কিন্তু সেই শান্তি বিনষ্ট হয়েছিল প্রায় দুই দশক ধরে। স্থানীয়ভাবে ‘কসাই’ খ্যাত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য (এমপি) এবং পরবর্তীতে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা আসাদুজ্জামান নূরের এই দীর্ঘ সময়ে উত্তরের এই শান্ত জনপদ হয়েছিল উচ্ছৃঙ্খল।


নীলফামারী-২ (সদর) আসনের এমপি হিসেবে ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তার সময়কালকে স্থানীয়রা বলেন, ‘ভয়ঙ্কর যুগ’। শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, সাধারণ মানুষও তখন রাতের আঁধারে নিজের বাড়িতে নিরাপদে ঘুমাতে পারত না। এমনকি কয়েকটি মসজিদের মুসল্লিরা আতঙ্কে নামাজ পড়তেও যেতেন না। 


২০০৬ সালে জেলা আওয়ামী লীগের ‘লগি-বৈঠা’ তাণ্ডব শুরু হয় জলঢাকার পূর্ব বালাগ্রামে। সেখানে সাদের হোসেন নামে এক জামায়াত কর্মীকে হত্যা করা হয়। এরপর শুরু হয় পুলিশি অভিযান। জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হন, পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নির্যাতনের শিকার হন। সাড়ে ১৫ বছরে জামায়াত নেতাকর্মীদের নামে ১৩২টি মামলা হয়, আসামি ৪০ হাজারের বেশি। বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা ৪৮টি, আসামি ৫ হাজারের বেশি। জেলা ও উপজেলা কার্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যায়, অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়।


২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর নীলফামারীর সদর উপজেলার লক্ষীচাপ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিশাল গাড়িবহর নিয়ে মহড়া দেন তৎকালীন এমপি আসাদুজ্জামান নূর। বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের বাড়ি অতিক্রম করার সময় পরিকল্পিতভাতে করা হয় হামলা। স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলে শুরু হয় সংঘর্ষ।


পুলিশ ১৪১ রাউন্ড শটগান ও ৩৭ রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। সে ঘটনায় নিহত হন পাঁচজন, আহত হন অর্ধশতাধিক মানুষ। তখনকার প্রশাসন ও পুলিশের উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগের কর্মীরা ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। খবর ছড়িয়ে পড়ে রামগঞ্জ বাজারে। রাতে জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মন্টুর দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেল শো-রুম, ওষুধের দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।


রামগঞ্জ বাজারের সংঘর্ষে দুটি মামলা হয়। একটিতে থানার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা বাবুল আকতার বাদী হয়ে আসামি করেন ১৪ জনকে, অজ্ঞাত প্রায় দেড় হাজার। আরেক মামলায় বাদী নিহত কৃষক লীগ নেতা খোরশেদ আলম চৌধুরীর আত্মীয় রাশেদ চৌধুরী নামোল্লেখ আসামি করেন ৮৬ জনকে, অজ্ঞাত আরও দেড় হাজার। দুটি মামলার আসামিই বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী।


এসব মামলা পুঁজি করে পুলিশ গ্রেফতার অভিযানের নামে রীতিমতো ‘বাণিজ্য’ শুরু করে, অর্থ আদায় হয় লাখে লাখে। ফলে পুরো এলাকা ভয়ে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। রামগঞ্জ, জলঢাকা, টুপামারী, লক্ষীচাপসহ নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকায় তখন রাত মানেই আতঙ্ক। মসজিদ, মাদ্রাসা, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব কিছু প্রায় অচল। স্থানীয়রা আশ্রয় নেন পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে। পুলিশি অভিযানে শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক সবাই হয়রানির শিকার হন।


জামায়াত ও বিএনপির আটজন চাকরিজীবী বরখাস্ত হন। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি মোজ্জাফর হোসেন ও তার ছেলে এনটিভির জেলা প্রতিনিধি ইয়াসিন মোহম্মাদ সিথুনসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের নামে মামলা হয়, হতে হয় কারাবন্দি।


এজাহারে নাম থাকা তিন নেতাকর্মী পরবর্তী সময়ে হত্যার শিকার হন। সদর উপজেলার লক্ষীচাপ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী, ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগের ছাত্র এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিনোদপুর থানা শাখার সভাপতি মহিদুল ইসলামকে হারাতে হয় জীবন।


গোলাম রব্বানীর স্ত্রী শাহানাজ বেগম বলেন, ‘তাকে আত্মীয়ের বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। আজও বিচার হয়নি।’


আতিকুলের বড় ভাই আবদুল ওয়াদুদ জানান, আতিক ঘটনার পর লুকিয়ে ছিল। ১৩ জানুয়ারি রাতে ডিবি পরিচয়ে তাকে টাঙ্গাইল থেকে তুলে নেওয়া হয়। দু-তিন দিন পর লাশ পাওয়া যায়।


নিখোঁজ মহিদুলের ভাই শহিদুল বলেন, মহিদুলের লাশ ১ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার শিবগঞ্জে অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়। পরে ছবি দেখে নেতাকর্মীরা তাকে শনাক্ত করে।


জেলা জামায়াতের আমির ও নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার বলেন, নূর ও তার অনুসারীরা জামায়াতের মেরুদণ্ড ভাঙতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাদের নেতাকর্মীরা শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলেন। তারাই আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।


জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মীর সেলিম ফারুক বলেন, রাজনীতির মূল্যবোধ ধ্বংস করা হয়েছে। ঘর, হাসপাতাল, চাকরি কিছুই নিরাপদ ছিল না।


জানা যায়, রামগঞ্জ, টুপামারী ও লক্ষীচাপ বাজার ছয় মাসের বেশি সময় ফাঁকা ছিল। মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়।


রামগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক ও আব্দুল ওহাব বলেন, ‘‘রাতের আঁধারে আওয়ামী ক্যাডাররা দোকানের তালা ভেঙে সব পণ্য নিয়ে গেছে। পুলিশের সহায়তা চেয়েও পাইনি।’’


নীলফামারীর শান্ত সবুজ ভূ-দৃশ্য আজও অপরূপ। কিন্তু সেসময়ের আতঙ্ক, হত্যা আর নিপীড়নের দাগ এখানকার মানুষের মনে আজও অম্লান। স্থানীয়দের ভাষায় ‘কসাই নূর’ এর সেই দুঃশাসন ছিল শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োগ নয়, এটি ছিল মানুষের জীবনের ওপর এক ভয়ঙ্কর ছায়া, যা নীলফামারীর ইতিহাসে গভীর কালিমা লেপন করেছে।


সূত্র: টাইমস টুডে