সাফল্যের চমকের আড়ালে ২১৯ শিক্ষার্থীর কান্না!
সূত্রঃ সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
শতভাগ জিপিএ-৫ ও শতভাগ পাসের রেকর্ড গড়ে দেশজুড়ে প্রতিবারই আলোচনায় আসে নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস্। তবে এই চোখধাঁধানো সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর চাপা কান্না ও শিক্ষাজীবন নষ্ট হওয়ার করুণ গল্প। অভিযোগ উঠেছে, কৃত্রিম সাফল্য বজায় রাখতে ও প্রতিষ্ঠানের কথিত 'সুনাম' ধরে রাখতে টেস্ট পরীক্ষার নামে কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে ২১৯ জন শিক্ষার্থীকে।
নবম থেকে এসএসসি: ঝরে গেছে ২১৯ শিক্ষার্থী
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে স্কুলটিতে নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল ৬০১ জন শিক্ষার্থী। তবে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় মাত্র ৩৮২ জন। অর্থাৎ নবম শ্রেণি থেকে এসএসসি বোর্ড পরীক্ষা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই প্রতিষ্ঠানটি থেকে ঝরে পড়েছে ২১৯ জন শিক্ষার্থী।
অভিভাবকদের অভিযোগ, মূলত দুটি কৌশলে স্কুল কর্তৃপক্ষ দুর্বল ও তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ছেঁটে ফেলে:
১. নির্বাচনি (টেস্ট) পরীক্ষায় অস্বাভাবিক কঠিন প্রশ্নপত্র তৈরি করা।
২. খাতা মূল্যায়নের সময় কঠোর নম্বর কর্তন করা, যাতে শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার উপযোগী শিক্ষার্থীরাই উত্তীর্ণ হতে পারে।
জানা যায়, ২০২৪ সালে নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার সময় বার্ষিক পরীক্ষায় বাদ পড়ে ১১৮ জন। বাকি ৪৮৩ জন দশম শ্রেণিতে উঠলেও টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করানো হয় ১৬৯ জনকে। পরবর্তীতে অভিভাবকদের দাবিতে রিটেক বা পুনর্পরীক্ষা নিয়ে ৬৮ জনকে পাস করানো হলেও ১০১ জনকে শেষ পর্যন্ত ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়নি।
কী বলছে স্কুল কর্তৃপক্ষ?
অভিযোগ অস্বীকার করে নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, "এসব কথা সত্য নয়, একটি মহল কয়েক বছর ধরে আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। যেসব শিক্ষার্থী টেস্টে এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করেছে, তারা অঙ্গীকারনামা দিয়েই ভর্তি হয়েছিল।"
তবে নির্বাচনি পরীক্ষায় টেনেটুনে পাস করা শিক্ষার্থীরা কীভাবে তিন মাসের ব্যবধানে সবাই জিপিএ-৫ পেল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, টেস্ট পরীক্ষার পর প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিশেষ ক্লাসের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়াদের প্রস্তুত করা হয়েছিল।
শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষাবিদদের বক্তব্য
টেস্ট পরীক্ষার অজুহাতে শিক্ষার্থী বাদ দেওয়া নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে সতর্ক করেছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি বলেন, "নির্বাচনি পরীক্ষায় পাস-ফেল বলে কিছু নেই। শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেই সে ফরম পূরণের যোগ্য। মূলত নিজেদের সুনাম জাহির করতেই স্কুলগুলো এ বাছাই প্রক্রিয়া চালায়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ এ বিষয়ে বলেন, "পাঁচ বছর একটি প্রতিষ্ঠানে পড়ার পর শিক্ষার্থী ফেল করলে তার দায় শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের। কৃত্রিমভাবে শতভাগ জিপিএ-৫ দেখানোর এই সংস্কৃতি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি। এই মূল্যায়ন পদ্ধতি দ্রুত বদলে ফেলা উচিত।"
সূত্র: জাগো নিউজ








