‘সিও’ এনজিওর বিরুদ্ধে কর্মী নির্যাতন করে ৩৭ লাখ টাকার স্ট্যাম্পে সই নেওয়ার অভিযোগ
সূত্রঃ সংগৃহীত
বিশেষ প্রতিবেদক
চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, কর্মীদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক ও শিক্ষাগত সনদের মূল কপি গ্রহণ, নির্যাতন, ব্ল্যাকমেইল এবং জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের মতো নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ‘সিও’ (Socio Economic Health Organisation—SHEO) নামের এনজিওর বিরুদ্ধে এবার এক কর্মীকে মারধর করে ৩৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী সেলিম রেজা (৩৩) নামের ওই কর্মী দাবি করেছেন, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর বাজারসংলগ্ন সিও শাখায় সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে রাতভর নির্যাতন করা হয়। এ বিষয়ে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) যশোরে সংবাদ সম্মেলন করে সিও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সেলিম রেজা বলেন, তিনি প্রায় দুই বছর ধরে সিওর চাঁদপুর শাখায় হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাঠপর্যায়ে অনাদায়ী টাকা আদায়ের জন্য প্রধান কার্যালয় থেকে তার ওপর নিয়মিত চাপ দেওয়া হতো। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ করতে না পারায় গত ৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৭টার দিকে প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কয়েকজন বহিরাগত তাকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সেলিম রেজার দাবি, একপর্যায়ে টাকা দিতে না পারায় তার দুই হাত পেছনে বেঁধে কাঠের লাঠি দিয়ে পায়ের তলায় ৬০ থেকে ৭০টি আঘাত করা হয়। তাকে হত্যার হুমকি দেওয়াসহ ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, পরে তাকে বাধ্য করে ১০০ টাকার তিনটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি স্ট্যাম্পে ৩৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে তাকে মারধর করে পরিবারের সদস্যদের ফোন দিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ব্ল্যাকমেইল করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
সেলিম রেজার ভাষ্য, পরে তাকে একটি মাইক্রোবাসে করে যশোরে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার বাবা ও চাচাকে ঝিনাইদহের অফিসে আসতে বাধ্য করা হয়। তাকে অন্য একটি কক্ষে জিম্মি রেখে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দুই মাসের মধ্যে ৩৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধের অঙ্গীকারসংবলিত ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
সেলিম রেজা অভিযোগ করেন, তার কাছ থেকে একটি টিভিএস আরটিআর মোটরসাইকেল, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরসাইকেলের কাগজপত্র, ব্ল্যাংক চেক, শিক্ষাজীবনে অর্জিত চারটি মূল সনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রেখে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এত বড় অঙ্কের টাকা পরিশোধের জন্য আমাকে ও আমার পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
তবে সেলিম রেজার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিওর শাখা ব্যবস্থাপক উল্লাস ও প্রধান কার্যালয়ের ডিজি মো. মেহেদী হাসান। তাদের দাবি, সেলিম রেজা প্রথমে ৮০ লাখ টাকা এবং পরে ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এদিকে, ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিকরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের সময় প্রধান হিসাবরক্ষক মো. বদরুল আলমের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত আচরণ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সাংবাদিকরা শাখা ত্যাগ করে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যান।
এর আগে ২০২৪ সালের ২১ মার্চ একই ধরনের অভিযোগ তুলে সিওর কয়েকজন সাবেক ও নির্যাতিত কর্মী ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছিলেন। ওই সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক এস এম রফিকুল ইসলামের নির্দেশে ১৫ এপ্রিল থেকে ঝিনাইদহ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ইয়ারুল ইসলাম তদন্ত শুরু করেন। তদন্তের শুরুতে অভিযোগকারীদের নোটিশ দিয়ে তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, ওই তদন্তের পর দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের অভিযোগ, পরবর্তীতেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠছে।
সেলিম রেজা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এমকে/বিএম২৪









