৪২ বছরে প্রথম ডিসি জেলেপল্লির পূজামণ্ডপে, উচ্ছ্বসিত স্থানীয়রা
মো. কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সাগরপাড়ের প্রত্যন্ত জেলেপল্লি পশ্চিম চাম্বলের বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দিরে ৪২ বছর ধরে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসছে। তবে স্থানীয় আয়োজকদের দাবি, পূজা শুরুর পর এই প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক মন্দিরটি পরিদর্শনে গেলেন। রোববার (১৮ অক্টোবর) মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উপস্থিতিতে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
দরিদ্র জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক। ঘুরে দেখেন পূজামণ্ডপের আয়োজন, ভাগাভাগি করেন উৎসবের আনন্দ। এ সময় নারীদের মধ্যে শাড়ি বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেন তিনি।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি গুরুধন দাশ বলেন, ‘দরিদ্রপীড়িত এই জেলেপল্লিতে ডিসি স্যারকে পেয়ে আমরা অনেক অনেক আনন্দিত। তিনি নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব পালনে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এতে আমরা অনেক আশ্বস্ত হয়েছি।’
কমিটির সাধারণ সম্পাদক রতন দাশ বলেন, প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে জেলা প্রশাসক তাঁদের দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানাতে আসবেন, তা তাঁরা কল্পনাও করেননি। তাঁর দাবি, ১৯৮৪ সালে মন্দিরে দুর্গাপূজা শুরু হওয়ার পর গত ৪২ বছরে এই প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক সেখানে এলেন।
‘সব সম্প্রদায়ের মানুষ সমানভাবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করবে’
জেলেপল্লির মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম দুর্গাপূজা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ যেন সমানভাবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করতে চাই, এই দেশে সব জাতি, সব সম্প্রদায়, সে যত ছোটই হোক, সরকার তাদের পাশে আছে। তারা তাদের উৎসবগুলো আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করবে।’
জেলেপল্লিতে আসার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে জেলা প্রশাসক বলেন, জেলে সম্প্রদায়ের মানুষও যাতে নির্বিঘ্নে ও আনন্দের সঙ্গে দুর্গোৎসব উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য তাঁরা সেখানে গেছেন। তাঁর ভাষ্য, পূজার আয়োজনের ক্ষেত্রে জায়গা বড় বিষয় নয়; বরং সবাই তাঁদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও রীতিনীতি পালন করে আনন্দের সঙ্গে উৎসব উদযাপন করতে পারছেন কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অতীতের হামলার ঘটনায় সতর্ক প্রশাসন
পশ্চিম চাম্বলের এই এলাকায় অতীতে পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাবাজার জলদাশপাড়ার পূজামণ্ডপে হামলার পাশাপাশি বাঁশখালীর ১৫টি মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি মন্দিরের প্রতিমা এবং ১৪টি মন্দিরের তোরণ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হন।
ওই ঘটনায় পুলিশ তিনটি মামলা করে। মামলাগুলোতে এজাহারনামীয় ৬২ জনসহ অজ্ঞাতনামা অনেককে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ২১ জনকে।
এবারের দুর্গাপূজায় যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, উৎসবের আনন্দ কেউ যাতে বিঘ্নিত করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আনসার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
বাঁশখালীর চারটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন
মহাসপ্তমীতে বাঁশখালীর চারটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। এগুলো হলো পশ্চিম চাম্বল বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দির, শ্রীশ্রী অদ্বৈতানন্দ ঋষিমঠ ও মিশন সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপ, সাধনপুর পল্লীমঙ্গল সমিতি মণ্ডপ এবং বাণীগ্রাম জগন্নাথধাম সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপ।
পরিদর্শনকালে তিনি পূজামণ্ডপগুলোর সাজসজ্জা ও আয়োজনের প্রশংসা করেন। নারী পুণ্যার্থীদের মধ্যে শাড়ি বিতরণের পাশাপাশি দুটি মণ্ডপে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
জাহিদুল ইসলাম জানান, এবার চট্টগ্রামে প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ বেড়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ২ হাজার ৫৯৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পূজামণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা ও জিআর চালের বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে।
প্রতিটি মণ্ডপের খোঁজখবর রাখতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। কর্মকর্তারা নিয়মিত মণ্ডপ পরিদর্শন করছেন এবং ট্যাগ অফিসাররাও আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন জানান, পূজামণ্ডপের সংখ্যা বাড়ায় আনসার ও ভিডিপি সদস্যের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। প্রান্তিক এলাকার মণ্ডপগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন তাঁরা। উৎসব শেষ হওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখার আহ্বান
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, এ দেশে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন। একে অপরের উৎসবে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের হয়তো অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। আমাদের হয়তো অনেক প্রাচুর্য না-ও থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের এই যে বন্ধন, এটি অনেক দৃঢ়, অনেক শক্তিশালী।’
প্রধানমন্ত্রীর ‘রেইনবো নেশন’ ধারণার কথা উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় রীতিনীতি রয়েছে। এসব স্বকীয়তা বজায় রেখেই সবাইকে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী দুর্গাপূজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে চট্টগ্রাম সফরে আসবেন। তাঁর সফরের ঘোষণায় বিভিন্ন এলাকায় উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের সঙ্গে পূজামণ্ডপগুলো পরিদর্শন করেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন, বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামজীদুর রহমান তন্ময় এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা।
মিশকাতুল ইসলাম বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। এই দেশে কোনো ভেদাভেদ নেই।’ তিনি পূজার নিরাপত্তায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং প্রত্যন্ত এলাকায় জেলা প্রশাসকের উপস্থিতির প্রশংসা করেন।
জেলেপল্লির মানুষের মুখে হাসি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, ‘আপনাদের সবার মুখের হাসি দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছে। আমাদের হয়তো অনেক উন্নত অবকাঠামো নেই, কিন্তু আমাদের অনেক বড় মন আছে, হৃদয় আছে।’
স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘পুরো প্রশাসন আপনাদের পাশে আছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আপনাদের পাশে আছেন। আপনারা আনন্দ করবেন, উৎসব করবেন, আপনাদের ধর্মীয় সব আচার-অনুষ্ঠান পালন করবেন।’
চার দশকের বেশি সময় ধরে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসা পশ্চিম চাম্বলের এই জেলেপল্লিতে জেলা প্রশাসকের প্রথম সফর স্থানীয় আয়োজকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি প্রশাসনের সরাসরি সহযোগিতা ও নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তাঁরা।








