স্ত্রীকে দোতলা থেকে ফেলে দিয়ে নিজেও লাফ, ইনানী রিসোর্টের আগুন থেকে বাঁচার বর্ণনা মাসুদের

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম
স্ত্রীকে দোতলা থেকে ফেলে দিয়ে নিজেও লাফ, ইনানী রিসোর্টের আগুন থেকে বাঁচার বর্ণনা মাসুদের

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ার টেক সৈকতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একই পরিবারের ছয় সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন পরিবারের তিন সদস্য—ইসমাইল রুহুল মাসুদ, তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেসা মিনা এবং তাঁদের ভাগ্নিজামাই আশিক।


শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও গুরুতর আহত হয়েছেন মেহেরুন্নেসা মিনা। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। তাঁর স্বামী ইসমাইল রুহুল মাসুদ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।


মাসুদ সীনহা গ্রুপের একজন মার্চেন্ডাইজার এবং তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেসা মিনা প্রিমিয়ার ব্যাংকে কর্মরত। তাঁরা রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।


ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর মাসুদ আগুন থেকে বেঁচে ফেরার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, গত বুধবার পরিবারের ১০ সদস্য একসঙ্গে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেন। ঘটনার আগের দিন পরিবারের একজন সদস্য ঢাকায় ফিরে আসেন। শনিবার তাঁদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।


দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকে পড়ে আগুন


মাসুদ জানান, শনিবার সকাল ৭টার দিকে হোটেল থেকে বের হওয়ার পরিকল্পনা থাকায় তাঁরা ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছিলেন। অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙার পর সেটি বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়েন। এর দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই পটমট শব্দ শুনতে পান তাঁরা। মুহূর্তেই চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।


তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্ত্রী মেহেরুন্নেসা ধোঁয়ার গন্ধ পেয়ে ঘরের দরজার লক খুলতেই করিডোরে জ্বলতে থাকা আগুনের বিশাল শিখা ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। করিডোর আগুনে ভরে যাওয়ায় অন্য কক্ষে থাকা স্বজনদের সতর্ক করা বা তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।


আগুন ও ধোঁয়ায় ঘর থেকে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেলে তাঁরা সামনের স্বচ্ছ কাচ ভাঙার চেষ্টা করেন। মাসুদ, তাঁর স্ত্রী ও ভাগ্নিজামাই আশিক মিলে কাচে লাথি মারলেও সেটি ভাঙেনি। পরে ঘরের একটি কাঠের চেয়ার দিয়ে কাচে আঘাত করেন মাসুদ। চেয়ারের পা ভেঙে গেলে সেটির ভাঙা অংশ দিয়ে কয়েকবার আঘাত করার পর কাচটি ভাঙতে সক্ষম হন তাঁরা।


স্ত্রীকে নিচে ফেলে দিয়ে নিজেও লাফ


মাসুদের বর্ণনা অনুযায়ী, ততক্ষণে ঘরের ভেতরেও আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। বের হওয়ার বিকল্প পথ না থাকায় দ্বিতীয় তলার ভাঙা কাচের অংশ দিয়ে নিচে নামার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। তাঁর স্ত্রী ভয় পেয়ে কাচ ধরে ঝুলে থাকলে মাসুদ তাঁর হাত ছাড়িয়ে নিচে ফেলে দেন। এরপর মাসুদ নিজে এবং তাঁর পেছনে থাকা আশিকও নিচে লাফ দেন।


নিচে পড়ার সময় একটি বড়ইগাছের বাধা পাওয়ায় সরাসরি মাটিতে আঘাত লাগেনি মাসুদের। তবে কোমরে গুরুতর চোট পান তিনি। অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রীর পায়ের একাংশ গভীরভাবে কেটে যায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়।


আগুনের তীব্র তাপ থেকে বাঁচতে তাঁরা হামাগুড়ি দিয়ে পাশের একটি ধানখেতে আশ্রয় নেন। পরে সেখান থেকে রিসোর্টের সামনে এসে ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের বাঁচার আকুতি শুনতে পান। স্বজনদের কেউ কেউ তাঁদের সন্তানদের উদ্ধারের জন্য চিৎকার করছিলেন বলে জানান মাসুদ।


ফারিয়ার সমুদ্র দেখার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল


এই ভ্রমণের পেছনে ছিল পরিবারের এক সদস্যের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা। মাসুদ জানান, তাঁর বড় বোনের মেয়ে ফারিয়া কবির মায়োপ্যাথিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি কখনো সমুদ্র দেখতে পারেননি। ফারিয়ার সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই পরিবারের সবাই মিলে কক্সবাজার ভ্রমণের আয়োজন করেছিলেন।


মাসুদের ভাষ্য, ফারিয়া বলেছিলেন, তিনি একা কোথাও যেতে পারেন না; সবাই মিলে গেলে সমুদ্র দেখতে পারবেন। তাঁরা দুইবার ফারিয়াকে কোলে করে ও চেয়ারে বসিয়ে সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে পানির সঙ্গে খেলে খুব আনন্দ পেয়েছিলেন তিনি।


ফেরার পথে চাঁদের গাড়িতে বসে ফারিয়া বলেছিলেন, ‘আমি যদি এই সমুদ্রের পাড়ে সব সময় থাকতে পারতাম, খুব শান্তি লাগত।’ মাসুদের আক্ষেপ, শেষ পর্যন্ত ফারিয়া সত্যিই সমুদ্রের পাড়েই চিরতরে থেকে গেলেন।


অগ্নিকাণ্ডের পর আহতদের প্রথমে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শনিবার রাতে তাঁদের ঢাকায় আনা হয়। মাসুদ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ থাকলেও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেসা মিনা বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।


এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।