শরীয়তপুরে সিজারিয়ানে বিলম্বের অভিযোগ, নবজাতকের মৃত্যু
সংগৃহীত
রবিউল মোল্লা, শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি
শরীয়তপুরের হাজী শরীয়তউল্লাহ জেনারেল হাসপাতালে উল্টো অবস্থানে থাকা নবজাতককে প্রসব করানোর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে নবজাতকের হাত-পা বের হলেও মাথা আটকে যায়। পরে নবজাতকটির মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রসববেদনা নিয়ে ওই ক্লিনিকে ভর্তি হন ১৯ বছর বয়সী স্বপ্না বেগম। পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির সময়ই চিকিৎসকদের জানানো হয়েছিল, গর্ভের শিশুটি উল্টো অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করতে বিলম্ব হওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তবে নবজাতকের মৃত্যু এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নিয়ে পরিবার ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
স্বপ্না বেগমের স্বামী সজল হাওলাদার ঢাকার শহীদনগর এলাকায় বসবাস করেন। গর্ভাবস্থায় দেখাশোনার সুবিধার্থে প্রায় তিন মাস আগে স্বপ্নাকে শরীয়তপুরে তাঁর মায়ের কাছে পাঠানো হয়। বুধবার সন্ধ্যায় প্রসববেদনা শুরু হলে তাঁর মা সালমা আক্তার (৩৮) তাঁকে হাজী শরীয়তউল্লাহ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।
পরিবারের ভাষ্য, হাসপাতালে নেওয়ার সময়ই গর্ভের শিশুর উল্টো অবস্থানের বিষয়টি জানানো হয়েছিল। চিকিৎসক এসে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করবেন বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। স্বপ্নার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে স্যালাইন দেওয়া হয় বলে জানান স্বজনেরা। তবে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক না আসায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
স্বজনদের দাবি, রাত ১১টার দিকে শিশুটির একটি পা বের হয়ে আসে। এ অবস্থায় ক্লিনিকের দুই নার্স পিয়ালি রানী ও আফরোজা স্বপ্নার মাকে অন্য ক্লিনিকে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে মেয়ের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তখন তাঁকে অন্যত্র নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান সালমা আক্তার।
পরিবারের অভিযোগ, একপর্যায়ে দুই নার্স স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে শিশুটিকে বের করার চেষ্টা করেন। এ সময় শিশুটির হাত-পা বের হলেও মাথা আটকে যায়। শিশুটিকে বের করতে টানাটানি করা হয় বলেও দাবি স্বজনদের। পরে নবজাতকটির মৃত্যু হয়।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর পাশের একটি ক্লিনিক থেকে গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পারসা সানজানাকে ডেকে আনা হয়। নবজাতকের অবস্থা দেখে তিনি দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং শিশুটি মারা গেছে বলে জানান।
পরিবারের আরও অভিযোগ, রাত ১টার দিকে দুই নার্স জরায়ুর পাশে কেটে শিশুটিকে বের করেন। পরে স্বপ্নার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রাত আড়াইটার দিকে তাঁকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সালমা আক্তার বলেন, “মেয়েকে হাসপাতালে নেওয়ার পরই জানিয়েছিলাম, গর্ভের শিশু উল্টো অবস্থানে রয়েছে। তারা বারবার বলেছে, ডাক্তার এলেই সিজার করা হবে। কিন্তু চার ঘণ্টা পার হলেও ডাক্তার আসেননি। পরে শিশুর পা বের হয়ে গেলে দুই নার্স টানাটানি করেন। একপর্যায়ে শিশুর মাথা আটকে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “আমার সন্তান ও নাতির সঙ্গে যা হয়েছে, তা অবহেলার কারণে হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমরা এর বিচার চাই।”
ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে ক্লিনিকের মালিক নয়ন সরকার বলেন, রাতে তাঁদের নিয়মিত চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অন্য চিকিৎসক এনে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
নয়ন সরকারের ভাষ্য, অন্য চিকিৎসক আসার সময় শিশুটির পা বের হয়ে গিয়েছিল। পরে ওই চিকিৎসক ঝুঁকি নিতে চাননি বলে চলে যান। এরপর নার্সরা প্রসব করানোর চেষ্টা করেন। শিশুটি মায়ের পেটেই মারা যায় বলে দাবি করেন তিনি।
নার্স, চিকিৎসক, অপারেশন থিয়েটারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নয়ন সরকার বলেন, রোগীর স্বজনেরা যা বলবেন, সবাই সেটিই বিশ্বাস করবেন; তাঁদের বক্তব্য কেউ বিশ্বাস করবেন না।
ওই সময় নারী আবাসিক মেডিকেল অফিসার উপস্থিত না থাকলেও একজন পুরুষ আবাসিক মেডিকেল অফিসার ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে চিকিৎসায় কোনো অবহেলা হয়নি বলেও জানান ক্লিনিক মালিক।
ক্লিনিকের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) চিকিৎসক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি পরিবারেরও অবহেলা থাকতে পারে। তাঁর দাবি, শিশুটি উল্টো অবস্থানে ছিল এবং তার হৃদস্পন্দন কম ছিল। এ তথ্য জানার পরও পরিবারের পক্ষ থেকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করানো হয়নি।
তবে প্রসূতির সংকটাপন্ন অবস্থার কথা তাঁকে সময়মতো জানানো হয়নি বলে স্বীকার করেন শরিফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “শিশুটির মায়ের অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা নার্সরা আমাকে বিষয়টি জানাননি। জানালে হয়তো সঠিক পরামর্শ দিতে পারতাম। রাত ১১টার দিকে আমাকে জানানো হয়। সেখানে গিয়ে দেখি, শিশুটির পা বের হয়ে আছে।”
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, ক্লিনিকটির অনুমোদন রয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত প্রতিবেদন বিভাগীয় দপ্তরে পাঠানো হবে। ক্লিনিকের অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পালং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে তাঁরা ঘটনাটি জানতে পারেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
ওসি জানান, পরিবারের অভিযোগ, শিশুটি উল্টো অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও নার্সরা স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করেন এবং পরে নবজাতকটির মৃত্যু হয়। পরিবারকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমকে/বিএম২৪









