ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম
ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার

সংগৃহীত

রাকিবুল ইসলাম, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি


জিওপলিটিক্স বা ভূরাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশ্বরাজনীতিতে এর ভূমিকা ব্যাপক। মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ নিকোলাস স্পাইকম্যান বলেছেন, “Geography is the most fundamental factor in foreign policy because it is the most permanent.” অর্থাৎ, ভূগোল পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে মৌলিক উপাদান, কারণ এটিই সবচেয়ে স্থায়ী।


একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান কখনো আশীর্বাদ হয়ে আসে, আবার কখনো বড় চ্যালেঞ্জের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও কার্যকর কূটনীতি থাকলে যেকোনো দেশই তার ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে। তাই বলা যায়, ভূরাজনীতি শুধু মানচিত্রের খেলা নয়; বরং ভৌগোলিক অবস্থানকে শক্তি, সম্ভাবনা ও প্রভাবের উৎসে পরিণত করার কৌশল।


এ ক্ষেত্রে তিনটি দেশের উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


প্রথম দৃষ্টান্ত সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশের মাত্র ছয় বছর আগে স্বাধীনতা অর্জন করা এই ছোট রাষ্ট্রটি তার কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমুদ্রবন্দর, বিনিয়োগ ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে দেশটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।


অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কৌশলগত অবস্থান বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। আবার ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর এবং এশিয়া-ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।


দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগকেন্দ্র বাংলাদেশ


দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে ভারত ও মিয়ানমার, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি প্রাকৃতিক সেতু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ ও ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।


২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ২০১৪ সালে সালিশি আদালতের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সমুদ্রে তার সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এ অর্জন দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছিল।


কিন্তু সমুদ্রসীমায় অধিকার প্রতিষ্ঠার পর সেই বিশাল জলরাশির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সমুদ্রসীমা অর্জন নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য; তবে সেই অর্জনকে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ।


প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান ও জ্বালানি খাতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশকে জ্বালানি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাই বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।


বঙ্গোপসাগর: অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিশাল ক্ষেত্র


বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাংলাদেশের গুরুত্ব শুধু সামুদ্রিক সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও জাপানের মতো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে।


এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য যেমন বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি সতর্ক ও দূরদর্শী কূটনীতির প্রয়োজনীয়তাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর আগ্রহকে কাজে লাগাতে হলে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।


মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত


এ ক্ষেত্রে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। বন্দরটি কার্যকরভাবে গড়ে তোলা ও পরিচালনা করা গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পণ্য পরিবহনের ব্যয় হ্রাস, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।


তবে শুধু বন্দর নির্মাণ করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে আধুনিক সড়ক ও রেল যোগাযোগ, শিল্পাঞ্চল, দক্ষ জনশক্তি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং কার্যকর লজিস্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে বন্দরের সক্ষমতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং বিনিয়োগের আর্থিক যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।


চীনের বিআরআই ও আঞ্চলিক যোগাযোগ


উদীয়মান বিশ্বশক্তি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের নানা উদ্যোগ রয়েছে। বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো উদ্যোগেও চীনের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে।


এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, শিল্প ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে এর অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।


অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাবের পাশাপাশি জাপানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আগ্রহও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের ‘বিগ-বি’ (Bay of Bengal Industrial Growth Belt) উদ্যোগের লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। জাপানের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে।


তবে কোনো দেশের উদ্যোগ অন্ধভাবে অনুসরণ না করে প্রকল্পের বাস্তবায়নযোগ্যতা, আর্থিক শর্ত, দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা এবং কৌশলগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।


বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ


বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখা। চীন ও জাপানের বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে পারে।


তবে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের নিরাপত্তা, আর্থিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।


বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ, স্বাধীন ও বাস্তবমুখী। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।


তবে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি মানে সব দেশের সঙ্গে হুবহু একই ধরনের সম্পর্ক রাখা নয়; বরং প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সক্ষমতা ও কৌশলগত প্রয়োজনকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা।


সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা


পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার কোনো কমতি নেই। প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কার্যকর বাস্তবায়ন। ভূরাজনীতি বাংলাদেশকে সুযোগ এনে দিতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করার দায়িত্ব দেশের নীতিনির্ধারক ও জনগণের।


বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে আধুনিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে রূপান্তর করা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে পরিপক্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংযোগকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।


এ জন্য প্রয়োজন সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে, ইনশাআল্লাহ।


মাওলানা মুহাম্মদ বোরহান উদ্দিন

তরুণ আলেম, ময়মনসিংহ


এমকে/বিএম২৪