ওয়াদা রাখতে হবে, না হলে রাজপথে আন্দোলন চলবে: জামায়াত আমির

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৮ এএম
ওয়াদা রাখতে হবে, না হলে রাজপথে আন্দোলন চলবে: জামায়াত আমির

সূত্রঃ বিডি মেইল

আনোয়ারুল ইসলাম রনি, রংপুর ব্যুরো প্রধান


নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার জনগণের সঙ্গে দেওয়া ওয়াদা পূরণ না করলে সংসদের ভেতরে প্রতিবাদের পাশাপাশি রাজপথেও আন্দোলন চলবে। আট দফা দাবি যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।


শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লং মার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।


বিএনপি সরকার গঠনের পর নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে অভিযোগ করে শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচিত হওয়ার আগে তারা দফায় দফায় জাতির কাছে ওয়াদা দিয়েছেন। কিন্তু সংসদে গিয়ে তারা সব ভুলে গেছেন। সরকার গঠনের পর একটি একটি করে তারা সব বিষয়ে উল্টো পথে হাঁটছেন।


তিনি বলেন, যে পথে হাসিনা হেঁটে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিলেন, বর্তমান সরকারকেও সেই একই পথে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। একই পথে হাঁটলে পরিণতিও একই হবে।


‘ভুল করেছি—এখন সংশোধন করব, ঘোষণা দিন’


১১ দলীয় ঐক্যের লং মার্চের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, বিএনপি যদি তাদের দেওয়া ওয়াদা পূরণ করে, তাহলে আজই ঘোষণা করে দিক—‘আমরা যা করেছি ভুল করেছি, এখন সব সংশোধন করে নেব।’


তিনি বলেন, শুধু ঘোষণা দিলেই হবে না, দৃশ্যমানভাবে প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন করে দেখাতে হবে। তাহলে লং মার্চের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু যদি তা না হয়, লং মার্চের পর কী হবে, সেটা আল্লাহ ভালো জানেন।


শফিকুর রহমান বলেন, সমস্ত অপশক্তি, অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই চলবে। আট দফা যেকোনো সময় জাতির প্রয়োজনে এক দফায় পরিণত হতে পারে। তবে সেই এক দফায় যাওয়ার আগেই সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হোক—এটাই তারা চান।


‘যদি না হয়, বসে বসে আঙুল চুষবো না। সংসদের ভিতরে তীব্র প্রতিবাদ এবং রাজপথে সমানতালে আন্দোলনও চলবে’—বলেন তিনি।


গণভোট নিয়ে সরকারের অবস্থানের সমালোচনা


গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিও সমাবেশে জোরালোভাবে তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা।


তিনি বলেন, সরকার সাহস করে সরাসরি বলে না যে তারা গণভোট মানে না। বরং ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা হচ্ছে, সংবিধানে গণভোট নেই। কিন্তু সংবিধানে যদি গণভোট না থাকে, তাহলে কোনো সংবিধান মেনে চব্বিশের গণবিপ্লবও হয়নি।


তার ভাষ্য, ফ্যাসিস্টদের সংবিধান অনুসরণ করে তাদের ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। সংবিধানের বাইরে গিয়েই ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশ করা হয়েছে। তাই যদি সংবিধানে গণভোট না থাকে, তাহলে ছাব্বিশ সালে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনও নেই, কোনো সরকারও নেই।


তিনি বলেন, ‘মানতে হলে সবটাই মানতে হবে। আর বাদ দিতে হলে সবটাই বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিতে হবে। তখন দেখা যাবে কার বুকের পাটা কতটুকু।’


সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে কোরআন-সুন্নাহর প্রসঙ্গ


সমাবেশে বক্তব্যের একপর্যায়ে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল-২০২৬ নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান শফিকুর রহমান।


তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কোরআন-সুন্নাহবিরোধী একটি আইন পাস করেছে। তার দাবি, আইনটি আল্লাহর কোরআন ও রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনার খেলাফ। এই আইনের কারণে ঘরে ঘরে বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকারকে এর মূল্য দিতে হবে। এই আইনের কারণে ঘরে ঘরে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। এই হারাম আইন প্রত্যাহার করে নিতে হবে।’


এর আগে জাতীয় সংসদে বিলটির আলোচনাতেও শফিকুর রহমান এর সঙ্গে কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির সাংঘর্ষিকতার কথা তুলে ধরে বিলটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।


‘চাঁদাবাজদের জ্বালায় জাতি অস্থির’


দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াত আমির।


তিনি বলেন, দেশে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, সার নেই, কর্মসংস্থান নেই। অথচ একদলের লোকেরা ঠিকই কাজ পাচ্ছে, সেই কাজ হলো চাঁদাবাজি। সারা দেশে চাঁদাবাজি আছে। চাঁদাবাজদের জ্বালায় জাতি অস্থির।


চাঁদাবাজির কারণে দ্রব্যমূল্য তিন-চারগুণ বেড়েছে দাবি করে তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের কারণে মানুষের জীবনও চলে যাচ্ছে। চাঁদা না পেয়ে মানুষ খুন করা হচ্ছে। এমনকি পরের মানুষ যখন চাঁদা দিতে পারে না, তখন নিজের মানুষকেও পাথর মেরে হত্যা করা হচ্ছে। যারা এসব করছে, তারা সন্ত্রাসী।


তিস্তা নিয়ে সরকারের প্রতি প্রশ্ন


উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন শফিকুর রহমান।


তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে লালমনিরহাটের এমপি ‘জাগো বাহে, কণ্ঠে সবাই তিস্তা বাঁচাই’—এমন আওয়াজ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর সংসদে পানিসম্পদ মন্ত্রী পরিষ্কারভাবে বলেছেন, যে নামেই হোক তিস্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে।


তিনি প্রশ্ন করেন, সাত মাস চলে গেলেও কোনো নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে না কেন? ‘কোন দিক থেকে কোন পানিপড়া খাইলেন, এখন যে আপনাদের কণ্ঠে এত জোর দেখি না’—মন্তব্য করে তিনি বলেন, জনগণকে বারবার ধোঁকা দেওয়া ঠিক হবে না।


শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে এই মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, সরকার নির্বাচিত হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষির রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। নদীগুলোর জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।


‘আট দফার একটি দাবিও আমাদের দলীয় নয়’


আট দফা দাবি নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আট দফার একটা দাবিও আমাদের দলীয় দাবি নয়। এসব দাবি ১৮ কোটি মানুষের দাবি।’


তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষের অধিকারের জন্যই তারা রাস্তায় নেমেছেন। সরকার জনগণের সঙ্গে কথা দিয়ে কথা রাখেনি।


গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রংপুর থেকেই ‘গণভোটে হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। জনগণ ৭০ শতাংশ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিয়েছে। কিন্তু সেই রায় মানা হয়নি, অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।


সমাবেশে বিভিন্ন দলের নেতাদের বক্তব্য


রংপুর জিলা স্কুল মাঠের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান এবং আমারবাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।


এ ছাড়া বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ কে এম হামিদুর রহমান আজাদ, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হালিম ও রফিকুল ইসলাম খান।


সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল এবং রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী।


সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন যারা


সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদনাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েক, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর রংপুর মহানগর আমির এটিএম আজম খানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।


ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে রংপুরে লং মার্চ


গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ আট দফা দাবি আদায়ে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে ঢাকা-রংপুর লং মার্চের আয়োজন করা হয়।


শনিবার সকালে ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে লং মার্চ শুরু হয়। এরপর গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস রোডে প্রথম পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ বাইপাস রোডে দ্বিতীয়, সিরাজগঞ্জের হাটিকমরুল মোড়ে তৃতীয়, বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড়ে চতুর্থ এবং গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পঞ্চম পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।


এসব পথসভায় জামায়াতের আমিরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন। পরে রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে লং মার্চের কর্মসূচি শেষ হয়।


১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।