সুপারহিরোদের ভিড়ে স্পাইডার-ম্যানই কেন এত জনপ্রিয়?
সূত্রঃ সংগৃহীত
বিনোদন ডেস্ক
সুপারহিরো জগতের অসংখ্য জনপ্রিয় চরিত্রের মধ্যে স্পাইডার-ম্যানের অবস্থান যেন আলাদা। কমিক বই থেকে টেলিভিশন, অ্যানিমেশন হয়ে বড় পর্দা—প্রতিটি মাধ্যমেই দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদের মুগ্ধ করে আসছে পিটার পার্কারের এই চরিত্র। সম্প্রতি ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ ঘিরে নতুন করে উন্মাদনা তৈরি হওয়ায় আবারও সামনে এসেছে প্রশ্ন—অন্য সব সুপারহিরোকে পেছনে ফেলে স্পাইডার-ম্যান এত জনপ্রিয় কেন?
কমিক বই থেকেই শুরু
স্পাইডার-ম্যানের জনপ্রিয়তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল কমিক বইয়ের পাতায়। স্ট্যান লি ও শিল্পী স্টিভ ডিটকোর সৃষ্টি এই চরিত্র প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। অল্প সময়ের মধ্যেই চরিত্রটি কমিক জগতে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
স্পাইডার-ম্যানকে ঘিরে প্রকাশিত কমিকের কোটি কোটি কপি বিক্রি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। রোমাঞ্চকর কাহিনি, আবেগঘন মুহূর্ত এবং একের পর এক শক্তিশালী খলনায়কের উপস্থিতি পাঠকদের আকৃষ্ট করেছে। ‘দ্য নাইট গোয়েন স্টেসি ডাইড’, ‘ক্রেভেনস লাস্ট হান্ট’ ও ‘স্পাইডার-ভার্স’-এর মতো গল্প চরিত্রটির জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করেছে।
শৈশবের স্মৃতিতে স্পাইডার-ম্যান
স্পাইডার-ম্যানের জনপ্রিয়তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের শৈশব। স্কুলের খাতা, ব্যাগ, টিফিন বক্স কিংবা জ্যামিতি বক্সে লাগানো স্টিকার থেকে শুরু করে পোশাক ও খেলনা—সবখানেই ছিল লাল-নীল পোশাকের এই সুপারহিরো।
শিশুদের কাছে স্পাইডার-ম্যান ছিল কল্পনার জগতের এক নায়ক। হাতে খেলনা মাকড়সা নিয়ে জাল ছোড়ার অভিনয় কিংবা পোশাকে প্রিয় চরিত্রের ছবি—এসব স্মৃতি বড় হওয়ার পরও মানুষের মনে থেকে যায়। ফলে বয়স বাড়লেও চরিত্রটির প্রতি ভালোবাসা অনেকের কাছেই অটুট থাকে।
টেলিভিশনে নতুন বিপ্লব
কমিকের গণ্ডি পেরিয়ে স্পাইডার-ম্যানকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় টেলিভিশন। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকের ‘স্পাইডার-ম্যান: দ্য অ্যানিমেটেড সিরিজ’সহ বিভিন্ন অ্যানিমেটেড সিরিজ চরিত্রটির জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন শিশুতোষ চ্যানেলে নিয়মিত স্পাইডার-ম্যানের অ্যানিমেটেড অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছে। চোখ ধাঁধানো অ্যানিমেশন ও খলনায়কদের সঙ্গে পিটারের লড়াই শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় পর্দার সামনে ধরে রাখত। এভাবেই স্পাইডার-ম্যান কমিকপ্রেমীদের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক পপ সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
বড় পর্দায় আলাদা পরিচয়
২০০২ সালে পরিচালক স্যাম রাইমির ‘স্পাইডার-ম্যান’ সিনেমায় টোবি ম্যাগুইয়ারের মাধ্যমে বড় পর্দায় নতুনভাবে পরিচিত হয় চরিত্রটি। সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং স্পাইডার-ম্যানকে চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় সুপারহিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এরপর অ্যান্ড্রু গারফিল্ড ও টম হল্যান্ডের অভিনয়ে চরিত্রটির ভিন্ন ভিন্ন রূপ দর্শকদের সামনে আসে। প্রতিটি প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ায় স্পাইডার-ম্যানের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে।
অন্যদের চেয়ে কেন এত আপন?
স্পাইডার-ম্যানের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার সাধারণ জীবনযাপন। সুপারম্যানের মতো অন্য গ্রহের বাসিন্দা কিংবা ব্যাটম্যানের মতো বিপুল সম্পদের অধিকারী নন পিটার পার্কার। তিনি একজন সাধারণ তরুণ, যাকে পড়াশোনা, অর্থনৈতিক চাপ, পরিবার, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার পাশাপাশি সামলাতে হয় সুপারহিরো হিসেবে নিজের দায়িত্ব।
‘মহৎ ক্ষমতার সঙ্গে আসে মহৎ দায়িত্ব’—এই দর্শন পিটার পার্কারের চরিত্রের অন্যতম ভিত্তি। তাই তার সংগ্রাম ও সংকটের সঙ্গে দর্শক খুব সহজেই নিজের জীবনের মিল খুঁজে পান।
অ্যাকশনের বাইরেও সম্পর্কের গল্প
স্পাইডার-ম্যানের গল্প শুধু লড়াই আর অ্যাকশনে সীমাবদ্ধ নয়। পিটার পার্কারের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কও দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
নেড লিডসের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব এবং এমজের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক গল্পে তৈরি করে আবেগের ভিন্ন মাত্রা। নিজের সুপারহিরো পরিচয় গোপন রাখার কারণে বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে তৈরি হওয়া দূরত্ব, ভুল-বোঝাবুঝি এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন চরিত্রটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে।
সামাজিক মাধ্যমেও জনপ্রিয়তার প্রমাণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও স্পাইডার-ম্যানের জনপ্রিয়তা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়। নেটিজেনদের অনেকেই মনে করেন, থর, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ বা ক্যাপ্টেন মার্ভেলের মতো অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী চরিত্রের তুলনায় স্পাইডার-ম্যানকে বেশি আপন মনে হওয়ার কারণ তার সাধারণ জীবন ও মানবিক দুর্বলতা।
ব্যর্থতা, ভয়, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যেও পিটার পার্কার লড়াই চালিয়ে যান। তার এই হার না মানার মানসিকতাই দর্শকদের কাছে চরিত্রটিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
জনপ্রিয়তার প্রভাব বক্স অফিসেও
স্পাইডার-ম্যানকে ঘিরে এই দীর্ঘদিনের উন্মাদনার প্রভাব পড়ছে সিনেমার বাণিজ্যিক সাফল্যেও। ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। দ্বিতীয় সপ্তাহেও সিনেমাটির আয় কমেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে শুধু উত্তর আমেরিকায় সিনেমাটি আয় করেছে ১৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। দুই সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী এর আয় ছাড়িয়েছে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে চলতি বছরের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমার তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে এটি।
সিনেমাটির বর্তমান সাফল্যের গতি অব্যাহত থাকলে বিশ্বব্যাপী ২ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকও পেরিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে কমিক, শৈশবের স্মৃতি, মানবিক গল্প, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সমন্বয়েই স্পাইডার-ম্যান আজও অন্য সব সুপারহিরোর ভিড়ে নিজের আলাদা জায়গা ধরে রেখেছে।
এমকে/বিএম২৪









