সম্পত্তিতে সমঅধিকার ছাড়া নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়: মহিলা পরিষদ
সূত্রঃ সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত না করে শুধু নীতিকথা বা সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে নারীর পূর্ণ সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
সংগঠনটি বলেছে, সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তির সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। তাই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সার্বিক সমতা নিশ্চিত করতে উত্তরাধিকারসহ সম্পদ-সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরি।
আন্তর্জাতিক সিডও দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব কথা বলা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে মহিলা পরিষদের আন্তর্জাতিক উপপরিষদের সদস্য লুনা নূর বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উত্তরাধিকার ও পরিবারকেন্দ্রিক সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থায় তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইনের কারণে অনেক নারী নিজের অর্জিত কিংবা পারিবারিক সম্পদ থেকেও বঞ্চিত হন।
প্রবন্ধে বলা হয়, জমি, বাড়ি বা অন্যান্য সম্পদে মালিকানা থাকলে নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমে এবং পরিবার ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে। অন্যদিকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীরা অনেক সময় পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হলেও নিজস্ব আশ্রয় বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাবে তা সহ্য করতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নারীর অবদান বাড়লেও জমির মালিকানায় তাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম বলে উল্লেখ করা হয়। সরকারি নীতিমালায় স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে খাসজমি দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এর যথাযথ প্রয়োগ হয় না।
মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, কাগজে-কলমে নারীর নামে বা যৌথ নামে সম্পত্তি থাকলেও অনেক সময় সেটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকে না। সমাজ, আইন, বিধি ও পারিবারিক পরিবেশ নারীদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নারীর সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সিডও সনদের ১১ নম্বর ধারায় সমান পারিশ্রমিক, একই মানের কাজের ক্ষেত্রে সমান আচরণ এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর বিভিন্ন অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশু পরিচর্যা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়।
নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির মালিকানা না থাকায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা না থাকায় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পেতে অনেক নারী উদ্যোক্তাকে সমস্যায় পড়তে হয়। ফলে অনেকে উচ্চ সুদে এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সীমিত পুঁজির কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী বড় বা টেকসই ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন না।
প্রবন্ধে জানানো হয়, বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিডও সনদে অনুস্বাক্ষর করে। শুরুতে কয়েকটি ধারায় সংরক্ষণ আরোপ করা হলেও বর্তমানে ২ এবং ১৬(১)(গ) ধারায় সংরক্ষণ বহাল রয়েছে। নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এসব সংরক্ষণ প্রত্যাহার ও বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন পরিবর্তনের দাবি জানানো হচ্ছে।
২০১৬ সালে সিডও কমিটিও বাংলাদেশের ৮ম সাময়িক প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে ২ ও ১৬(১)(গ) ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারের তাগিদ দেয়। একই সঙ্গে সব ধর্মের নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরুর সুপারিশ করা হয়।
মহিলা পরিষদ মনে করে, নারীর পূর্ণ মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় এসব সংরক্ষণ বড় বাধা। তাই বৈষম্যমূলক আইন পরিবর্তন, সমতাভিত্তিক পারিবারিক আইন প্রণয়ন এবং সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
বৈষম্য নিরসনে মহিলা পরিষদের পাঁচ সুপারিশ
১. আইনগত ও সাংবিধানিক সংস্কার: বৈষম্যমূলক প্রথাগত ও ব্যক্তিগত আইন সংশোধন করে সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা।
২. যৌথ মালিকানা নিশ্চিত করা: বিবাহিত জীবনে অর্জিত সম্পত্তি ও সরকারি খাসজমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ মালিকানা নিশ্চিত করা।
৩. সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন: পিতৃতান্ত্রিক সংস্কার ও বৈষম্যমূলক সামাজিক প্রথা পরিবর্তনে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।
৪. সহজ শর্তে ঋণ ও ব্যাংকিং সুবিধা: জামানত ছাড়াই বা বিকল্প জামানতের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং ও আর্থিক সুবিধা সহজ করা।
৫. বিনামূল্যে আইনি সহায়তা: জমি ও সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত বা নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য দ্রুত ও বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা নিশ্চিত করা।
মতবিনিময় সভায় উইমেন ফর উইমেনের সভাপতি ও দীপ্ত ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া কে হাসান, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমী, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর চন্দন লাহিড়ী এবং উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুন নাহার মিষ্টি বক্তব্য দেন।
মুক্ত আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম এনালিস্ট ও ইউনিট ম্যানেজার (জেন্ডার রেসপনসিভ গভর্ন্যান্স) তপতী সাহা, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং মহিলা পরিষদের আন্তর্জাতিক উপপরিষদের সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. সিউতি সবুর।
এমকে/বিএম২৪









