যুক্তরাষ্ট্রে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেলেন ড. ইউনূস, দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন ৪০০ অতিথি

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৪ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেলেন ড. ইউনূস, দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন ৪০০ অতিথি

সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


শান্তিতে নোবেলজয়ী ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। ওয়াশিংটন ডিসির জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তার হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। এ সময় উপস্থিত প্রায় ৪০০ অতিথি দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে ড. ইউনূসকে সম্মান জানান।


শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে বাসস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্টন হলরুমে এ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় ২৫টি দেশের রাষ্ট্রদূত, উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও গবেষকসহ প্রায় ৪০০ অতিথি উপস্থিত ছিলেন।


অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের নাম ঘোষণার পর অতিথিরা দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় করতালি দিয়ে তাকে সম্মান জানান।


এ বছর ড. ইউনূসসহ মোট চারজনকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। অন্য তিনজন হলেন ভারতের সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের (সেবা) পরিচালক রিমা নানাবতী, ফ্যাশন ডিজাইনার ও টোরি বার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা টোরি বার্চ এবং জর্ডানের মাইক্রোফান্ড ফর উইমেনের বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ান। মুনা সুখতিয়ানকে বিশেষ ‘জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।


পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের কাজের প্রশংসা করে হিলারি ক্লিনটন বলেন, তিনি নিজে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম দেখেছেন। এ ব্যাংকের মাধ্যমে নারীরা কীভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এবং ক্ষমতায়িত হয়েছেন, তা অভূতপূর্ব। শুধু বাংলাদেশেই নয়, ড. ইউনূস তার কাজের পরিধি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন।


পুরস্কার গ্রহণের পর বক্তব্যে ড. ইউনূস তার কাজের ৫০ বছর পূর্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাদের দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এ আয়োজন বাংলাদেশের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেবে এবং গ্রামীণ পরিবারের সদস্যদের অনুপ্রাণিত করবে।


দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে গ্রামীণ ব্যাংকের ভূমিকা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের নিজেদের সামর্থ্য কাজে লাগানো, দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা পরিবারগুলোর জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আগে যারা নিজেদের প্রয়োজন ও সমস্যার কথা বলতে সংকোচ বোধ করতেন, এখন তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের কথা তুলে ধরেন। এসব নারী নিজেরাই ব্যাংক পরিচালনা করেন এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানার সঙ্গেও যুক্ত।


ঋণগ্রহীতাদের সন্তানদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে চাকরিদাতা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নিজেদের উদ্যোগে ব্যবসা গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।


সামাজিক ব্যবসার ধারণা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন নয়, বরং সামাজিক সমস্যার সমাধান করা। স্বাস্থ্যসেবা খাতে সামাজিক ব্যবসার তহবিল থেকে বিভিন্ন এলাকায় হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চক্ষু হাসপাতাল গড়ে তুলতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ পুনরায় স্বাস্থ্যসেবা খাতেই বিনিয়োগ করা হচ্ছে।


বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে ড. ইউনূস বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তোলার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে সৃজনশীল ও উদ্যোগী করে গড়ে তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ হওয়া উচিত উদ্যোক্তা তৈরি করা।


এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ চালুর আশাও প্রকাশ করেন তিনি। ড. ইউনূস বলেন, তিন শূন্যের পৃথিবী গড়ার পথে এ বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দিতে পারে। শিক্ষার্থীদের শুধু সনদের পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা হবে। ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নসহ অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হবে।


শিক্ষাক্ষেত্রে এ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার সূচনা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন ড. ইউনূস।