নৌ-চ্যানেলে অবৈধ জালে বিপাকে জাহাজ, বাড়ছে জেলে-শ্রমিক সংঘাত

প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
নৌ-চ্যানেলে অবৈধ জালে বিপাকে জাহাজ, বাড়ছে জেলে-শ্রমিক সংঘাত

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে দেশের বিভিন্ন নদীবন্দরে প্রতিদিন হাজার হাজার টন পণ্য পরিবহনকারী লাইটার জাহাজ চলাচলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নৌ-চ্যানেলে অবৈধভাবে পাতা মাছ ধরার জাল। এ কারণে জাহাজশ্রমিক ও জেলেদের মধ্যে বিরোধ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। জাহাজের প্রপেলারে জাল আটকে যাওয়ায় একদিকে যেমন পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে, অন্যদিকে জাল নষ্টের অভিযোগে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘাত, হামলা ও ভয়ভীতির ঘটনাও বাড়ছে।


জাহাজ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জেলে পাড়া-পারকি বিচ, শিপ চ্যানেল-কুতুবদিয়া, সি বিচ-ভাসানচরসহ বন্দরসংলগ্ন বিভিন্ন নৌ-চ্যানেলে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে মাছ ধরার জাল বসানো হচ্ছে। পানির নিচে থাকা এসব জাল অনেক সময় নাবিকদের চোখে পড়ে না। ফলে চলন্ত জাহাজের প্রপেলারে জাল জড়িয়ে গেলে জাহাজ থামিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করে তা অপসারণ করতে হয়।


চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন হাজার লাইটার জাহাজ, অয়েল ট্যাংকার ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে। এর মধ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন লাইটার জাহাজ রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি। পাশাপাশি বহির্নোঙরে শত শত বিদেশি মাদার ভেসেলও আসে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব জাহাজের অনেককেই একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।


একজন লাইটার জাহাজের ক্যাপ্টেন জানান, বড় দুর্ঘটনা না ঘটলেও প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো জাহাজের প্রপেলারে জাল আটকে যায়। এতে নাবিকদের দীর্ঘ সময় ধরে জাল খুলতে হয় এবং বেশির ভাগ ঘটনাই আনুষ্ঠানিকভাবে কোথাও জানানো হয় না। তিনি বলেন, গত ছয় দিনেই দুইবার এমন পরিস্থিতির মুখে পড়ে প্রায় ১৫ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে জাহাজের সময়সূচি ও পরিচালন ব্যয়ের ওপর।


আরেক ক্যাপ্টেনের ভাষ্য, সাগরের শুরু থেকে আউটার অ্যাংকারেজ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে বড় বড় জাল পেতে রাখা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।


জাহাজশ্রমিকদের অভিযোগ, জাল ছিঁড়ে গেলে অনেক সময় জেলেরা ক্ষতিপূরণের দাবি তুলে মাস্টার, সুকানি ও শ্রমিকদের ঘিরে ফেলেন। কোথাও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভাঙচুর কিংবা জোরপূর্বক আটকে রাখার মতো ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি ভাসানচর এলাকায় দুটি লাইটার জাহাজের একজন মাস্টার ও একজন সুকানিকে জোর করে তুলে নেওয়ার অভিযোগের পর শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে।


চট্টগ্রাম লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সবুজ শিকদার বলেন, বিষয়টি শুধু মাছ ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাহাজ চলাচল, নৌ-নিরাপত্তা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং দেশের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।


জাহাজ মালিক ও শ্রমিকদের দাবি, নিয়মিত জাহাজ চলাচলকারী নৌ-চ্যানেলে নিরাপদ করিডোর নির্ধারণ করে সেখানে সব ধরনের জাল ও মাছ ধরার ফাঁদ নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ জাল অপসারণে কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ, মৎস্য বিভাগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, নৌ-বাহিনী জাহাজ চলাচলের নির্ধারিত পথ চিহ্নিত করে দিলে সেখানে জাল বসানোর সুযোগ থাকে না। তবে এ বিষয়ে কী অগ্রগতি হয়েছে, তা এখনও তার জানা নেই।


চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, নৌ-চ্যানেলে জাল ফেলে জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে।


কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, নৌ-পথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি বা জাহাজশ্রমিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।



এমকে/বিএম২৪