নিখোঁজের আগে তাহসিফের সঙ্গে ৬ ঘণ্টা ছিলেন দ্বীপ, হত্যার সন্দেহ বাবার

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১০ পিএম
নিখোঁজের আগে তাহসিফের সঙ্গে ৬ ঘণ্টা ছিলেন দ্বীপ, হত্যার সন্দেহ বাবার

সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরি নিখোঁজ হওয়ার আগে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দ্বীপের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন। এ সময় তারা মোটরসাইকেল মেরামত করান এবং একসঙ্গে রাতের খাবার খান। তবে ছেলের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মনে করছেন না তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তার সন্দেহ, তাহসিফকে হত্যা করে তুরাগ নদে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।


বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা পোস্টকে দ্বীপ জানান, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি তাহসিফের উত্তরার বাসায় যান। রাত ১২টার কিছু আগে-পরে সেখান থেকে বের হন। মোটরসাইকেলে সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেটি মেরামতের বিষয়ে পরামর্শ নিতে তাহসিফ তাকে ডেকেছিলেন।


দ্বীপ বলেন, বয়সে তাহসিফ তার চেয়ে দুই থেকে তিন বছরের বড় হলেও তাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রয়েছে। দুজনের মোটরসাইকেলের মডেলও একই। সেদিন বাসা থেকে বের হয়ে তারা একটি ওয়ার্কশপে মোটরসাইকেল মেরামত করান। পরে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে তাহসিফকে বাসায় রেখে তিনি মোহাম্মদপুরের উদ্দেশে রওনা হন।


দ্বীপের দাবি, তাহসিফের মৃত্যুর বিষয়ে তার কাছে বিশেষ কোনো তথ্য নেই। তাদের দুই পরিবারের মধ্যেও ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তাহসিফের ময়নাতদন্তের সময় তিনি হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন বলেও জানান।


ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ভবনের নিচের গ্যারেজে এক ব্যক্তির সঙ্গে হাত মেলান তাহসিফ। পরে তারা পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। তাহসিফের পরিবার ওই ব্যক্তিকে দ্বীপ হিসেবে শনাক্ত করেছে।


পরিবারের দাবি, দ্বীপের ডাকে সেদিন বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। মাকে নিচে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসার কথা জানিয়ে বের হলেও আর বাসায় ফেরেননি তিনি। পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ছেলেকে হত্যার সন্দেহ বাবার

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম মনে করছেন, তার ছেলের মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা থাকতে পারে। তার সন্দেহ, তাহসিফকে হত্যা করে নদে ফেলে দেওয়া হয়েছে।


বৃহস্পতিবার দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ঘটনার দিন তাহসিফ সারাদিন মায়ের সঙ্গে ছিলেন। মা-বাবার জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন। সন্ধ্যার দিকে দ্বীপ তাকে ডাকতে এলে মাকে জানিয়ে নিচে যান। এরপর বারবার ফোন করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।


বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১টার পর তাহসিফ তার মাকে বার্তা দিয়ে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।


ছেলের কোনো শত্রু ছিল না উল্লেখ করে কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, তাহসিফ অত্যন্ত ভদ্র ও সামাজিক ছিলেন। বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার কারণে কিছুটা মানসিক কষ্ট থাকলেও তা নিয়ে বড় কোনো সমস্যা ছিল না বলে তার ধারণা। বিমানবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হতে তাহসিফকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল এবং তিনি উড্ডয়নেও দক্ষ ছিলেন। এসব কারণে ছেলের আত্মহত্যা করার বিষয়টি তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।


মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, জানাজা ও দাফনের কাজ শেষ করার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ ছাড়া রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, ওই এলাকায় তাহসিফ কখনো যেতেন না।

যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ

নৌ-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন।


উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। হাতঘড়ি এবং পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।


তাহসিফের বাবা তুরাগ থানায় ছেলের বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে পুলিশ প্রথমে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। পরে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ফোন করে মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।


বৃহস্পতিবার সকালে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মুস্তাফিজুর রহমান মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। নিহতের খালাতো ভাই জহির হাসান মরদেহটি শনাক্ত করেন। সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়া এবং পেট ফোলা থাকার তথ্য উঠে আসে।


বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনরা মরদেহ নিয়ে উত্তরার উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাহসিফকে দাফন করা হয়। এ সময় স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।


ঢাকা জেলা নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এমকে/বিএম২৪