শেষ বাঁশির পর যে অশ্রু ইতিহাস হয়ে থাকবে
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
কান্না কখনো কখনো শব্দের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শেষ বাঁশি বাজার পর মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তখন একসঙ্গে দুটি দৃশ্য। এক পাশে স্পেনের উল্লাস লাল জার্সির খেলোয়াড়দের দৌড়,
গ্যালারিজুড়ে পতাকার ঢেউ, কনফেটির বৃষ্টি, বিশ্বকাপ হাতে তোলার অপেক্ষা। অন্য পাশে এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন নিঃশব্দে। তাঁর চারপাশেও মানুষ আছে, ক্যামেরা আছে, আলো আছে কিন্তু তিনি যেন সম্পূর্ণ একা।
লিওনেল মেসি।
কয়েক মুহূর্ত আগেও তিনি লড়ছিলেন শেষ শক্তিটুকু দিয়ে। শেষ বাঁশি বাজতেই মাথা নিচু হয়ে এলো। চোখের কোণে জমল জল। সেই জল লুকানোর চেষ্টা ছিল, কিন্তু কিছু কান্না লুকানো যায় না। পৃথিবীর কোটি মানুষের কাছে তিনি হয়তো ভিনগ্রহের ফুটবলার, কিন্তু পরাজয়ের মুহূর্তে তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ যার বুক ভেঙে যায়, যার স্বপ্ন অপূর্ণ থাকে, যার চোখও ভিজে ওঠে।
ধীরে ধীরে সবুজ ঘাসে বসে পড়লেন তিনি। তারপর নিজেকে সঁপে দিলেন সেই মাঠের বুকেই। যে মাঠ তাঁর পায়ের ছোঁয়ায় অসংখ্যবার বিস্মিত হয়েছে, যে মাঠ তাঁকে দিয়েছে অগণিত জয়, আবার দিয়েছে গভীরতম হতাশাও সেই মাঠ যেন শেষবারের মতো আগলে রাখল তার সবচেয়ে প্রিয় শিল্পীকে।
ম্যাচের স্কোরলাইন বলবে, অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে স্পেন ১–০ ব্যবধানে হারিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। পরিসংখ্যান বলবে, স্পেন জিতেছে বিশ্বকাপ। ইতিহাসের পাতায় আরেকটি শিরোপা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু স্কোরলাইন কখনো বলে না, একটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর একজন মানুষের চোখে কতটা জল জমেছিল।
হয়তো কয়েক বছর পর মানুষ এই ফাইনালের গোলদাতার নাম ভুলে যাবে। কিন্তু সবুজ ঘাসের ওপর বসে থাকা মেসির সেই ছবিটি ভুলবে না।
বাংলাদেশেও তখন গভীর রাত। তবু ঘুমিয়ে ছিল না দেশের অসংখ্য মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি, সিআরবি, খুলনার মোড়, রাজশাহীর চায়ের দোকান কিংবা কোনো গ্রামের উঠোনে বড় পর্দার সামনে বসে থাকা তরুণদের মুখেও তখন একই নীরবতা। কেউ টেলিভিশন বন্ধ করে উঠে গেছেন। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু লিখেছেন"ধন্যবাদ, মেসি।" আবার কেউ কিছুই লেখেননি। শুধু চুপচাপ বসে থেকেছেন।
কারণ, এই পরাজয় শুধু আর্জেন্টিনার ছিল না। এই পরাজয় ছিল সেই প্রজন্মের, যারা বড় হয়েছে মেসির পায়ের জাদু দেখে।
রোজারিও শহরের ছোট্ট একটি ছেলের গল্প একদিন থেমে যাওয়ার কথা ছিল। গ্রোথ হরমোনের জটিলতায় চিকিৎসকেরা শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। পরিবারের পক্ষে চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে উঠেছিল। তখনও কেউ জানত না, এই শিশুটিই একদিন ফুটবলের অভিধান বদলে দেবে।
একটি ন্যাপকিনে লেখা চুক্তি তাঁকে নিয়ে যায় বার্সেলোনায়। সেখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাস।
তারপর শুধু এগিয়ে যাওয়া। গোল, ট্রফি, করতালি, রেকর্ড। বার্সেলোনার নীল-লাল জার্সিতে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্য শিল্পী। ফুটবল যেন তাঁর পায়ে এসে নতুন ভাষা শিখেছিল।
তবু জাতীয় দলের জার্সি তাঁকে সহজে কিছু দেয়নি।
২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গ। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার। একসময় অভিমানে জাতীয় দলকেই বিদায় বলে দিয়েছিলেন। সেদিন অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই বুঝি গল্পের শেষ।
কিন্তু সত্যিকারের কিংবদন্তিরা শেষ অধ্যায় নিজেরাই লেখেন।
তিনি ফিরে এসেছিলেন। আবার লড়েছিলেন। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয় দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন। সেই রাতে বুয়েনস আইরেস থেকে ঢাকা কিংবা পর্যন্ত আনন্দে কেঁপে উঠেছিল অগণিত হৃদয়।
এরপর সময় এগিয়েছে। বয়স বেড়েছে। গতি কমেছে। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা কমেনি একটুও।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হয়তো তাঁর শেষ বিশ্বমঞ্চ। শেষবারের মতো দেশের জার্সি গায়ে স্বপ্ন দেখার উপলক্ষ। সেই স্বপ্নের শেষ প্রান্তে এসে অপেক্ষা করছিল পরাজয়।
ফুটবল এমনই নির্মম।
যে খেলা একজন মানুষকে অমরত্ব দেয়, সেই খেলাই একদিন তাকে অশ্রুসিক্ত করে বিদায় জানায়।
তবু মেসির গল্পকে একটি হারের ভেতরে আটকে রাখা যায় না। কারণ, তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো ট্রফি নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন তিনি কোটি কোটি শিশুকে ফুটবল ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন, প্রতিভা ঈশ্বরের দান হতে পারে, কিন্তু কিংবদন্তি হতে হলে প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করতে হয়। তিনি শিখিয়েছেন, ব্যর্থতা লজ্জার নয়; ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
স্টেডিয়ামের আলো একসময় নিভে যাবে। গ্যালারি খালি হয়ে যাবে। নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গল্প লেখা হবে। সময়ের সঙ্গে নতুন নায়কও জন্ম নেবে।
কিন্তু সবুজ গালিচায় মাথা নিচু করে বসে থাকা সেই মানুষটির কয়েক ফোঁটা অশ্রু ফুটবল ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে।
কারণ, সব কিংবদন্তি ট্রফি হাতে নিয়ে বিদায় নেন না। কেউ কেউ বিদায় নেন চোখভরা অশ্রু নিয়ে। আর সেই অশ্রুই তাঁদের আরও অমর করে তোলে...
লিওনেল মেসিও তেমনই একজন।
ফুটবল যদি শেষ দিনে তাঁকে খালি হাতে ফিরিয়েও দেয়, তিনি ফুটবলকে কখনো খালি হাতে ফেরাননি। তিনি দিয়ে গেছেন সৌন্দর্য, বিনয়, সংগ্রাম, প্রত্যাবর্তনের সাহস আর কোটি কোটি মানুষের শৈশব, কৈশোর ও স্বপ্নের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলো....
হয়তো বহু বছর পর এই ফাইনালের ফল মানুষ ভুলে যাবে। কিন্তু একটি দৃশ্য ভুলবে না
শেষ বাঁশির পর, সবুজ ঘাসের ওপর বসে থাকা এক মানুষ। তাঁর চোখে জল। আর সেই জলেই প্রতিফলিত হচ্ছে দুই দশকের এক অনন্য ফুটবল-জীবনের সমগ্র ইতিহাস।








