৪৪৮ কোটি টাকার তীররক্ষা বাঁধে ধস,দুটি স্কুল নদীগর্ভে বিলীনের সম্ভাবনা

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
৪৪৮ কোটি টাকার তীররক্ষা বাঁধে ধস,দুটি স্কুল নদীগর্ভে বিলীনের সম্ভাবনা

শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীররক্ষা বাঁধের কাঁচকোল এলাকায় আবারও ধস দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের সরকটারী এলাকায় প্রায় ৬০ মিটার ব্লক পিচিং ধসে ভাঙন শুরু হয়। এতে নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে নতুন করে ভাঙন-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এ নিয়ে বাঁধটির অন্তত ১৫০ থেকে ১৬০ মিটার এলাকায় ধসের ঘটনা ঘটল।

শুক্রবার(১৭ জুলাই) সকালে সরেজমিনে কাঁচকোল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্রের তীব্র স্রোতে ব্লক পিচিং ধসে নদীগর্ভে চলে গেছে। কোথাও কোথাও বাঁধের রাস্তার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, তাঁর বাড়ি বাঁধের পশ্চিম পাশে। বৃষ্টি না থাকলেও হঠাৎ করেই বাঁধের ব্লক পিচিং ধসে পড়ে। পরে বিষয়টি পাউবোকে জানানো হলে রাতে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়।

আরেক বাসিন্দা মাইদুল ইসলাম বলেন, বাঁধ নির্মাণের শুরু থেকেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তাঁর অভিযোগ, 'নিম্নমানের নির্মাণ উপকরণ দিয়ে ব্লক পিচিং করা হয়েছে, ফলে নদীর পানি বাড়লেই ধস দেখা দিচ্ছে। প্রতিবছর একই এলাকায় ভাঙন হলেও এখনো স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এলাকার বাসিন্দা খয়বার আলী বলেন, উত্তর ওয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কাঁচকোল বড়ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বিস্তীর্ণ এলাকা ও দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

পাউবো ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীররক্ষা প্রকল্পের আওতায় বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। তবে নির্মাণের দুই বছর পর, ২০১৮ সাল থেকেই বিভিন্ন স্থানে ধস দেখা দিতে শুরু করে। প্রতিবার জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। চলতি মাসের ১ জুলাইও কাঁচকোল এলাকার তিনটি স্থানে প্রায় ১০০ মিটার ব্লক পিচিং ধসে যায়। তখন ছয় হাজার জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলেও ১৫ দিনের ব্যবধানে একই এলাকায় আবারও ধস দেখা দিল।

কাঁচকোল এলাকার বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, প্রতি বর্ষা মৌসুম এলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। এবারও বাঁধে ধসের পর থেকে উদ্বেগে দিন কাটছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বসতভিটা ও ফসলি জমি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

কেন বারবার ধসছে তীররক্ষা বাঁধ

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বছরের পর বছর অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন, ভেজা বালুভর্তি ভারী ডাম্পার ট্রাকের চলাচল এবং বাঁধ কেটে একাধিক সংযোগ সড়ক নির্মাণের কারণে তীররক্ষা বাঁধের বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ কারণে বর্ষায় নদীর স্রোত বাড়লেই একই স্থানে বারবার ধস দেখা দিচ্ছে।

সরেজমিনে চিলমারী উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকোল থেকে ফকিরেরহাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ডান তীররক্ষা বাঁধের অন্তত নয়টি স্থানে বালুবাহী ডাম্পার ট্রাক চলাচলের জন্য বাঁধ কেটে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কালিরকুড়া টি-বাঁধ থেকে ফকিরেরহাট বাঁধমোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় সাতটি স্থানে বাঁধ কেটে রাস্তা করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব সংযোগ সড়ক নির্মাণে নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের ব্লক পিচিংও ব্যবহার করা হয়েছে।

কাঁচকোল এলাকার বাসিন্দা মো. খতিব উদ্দিন বলেন, ‘ডান তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর নদীভাঙনের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছিলাম। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে আবার তীর ধস শুরু হয়েছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই এলাকায় ধসের ঘটনা ঘটলেও বালু উত্তোলন ও ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে জরুরি মেরামতের পরও বাঁধের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

রিভারাইন পিপল-এর পরিচালক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ২০১৬ সালে বাঁধ নির্মাণের দুই বছরের মধ্যে ভাঙন প্রমাণ করে নির্মাণে কতটা দুর্নীতি হয়েছে। এছাড়াও প্রতিবছর বাঁধ রক্ষানাবেক্ষণ না করা, অনিয়ন্ত্রিত বালুবাহী ভারী যানবাহন চলাচল এবং বাঁধের কাছাকাছি স্থান থেকে বালু উত্তোলনের কারণে ধস হতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বাঁধ রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলানোর পাশাপাশি বাঁধ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ২০১৬ সালে চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষায় চার কিলোমিটার ব্লক পিচিং বাঁধ নির্মাণ করা হয়। চলতি মাসের শুরুতে তিনটি স্থানে প্রায় ১০০ মিটার এবং বৃহস্পতিবার আরও ৬০ মিটার এলাকায় ধস দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ৪০০ জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হচ্ছে। এ ছাড়া আরও ১২ হাজার জিও ব্যাগের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত সেগুলো ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হবে।