পানি নেমেছে, দুর্ভোগ নয়: ভাঙা সড়কে থমকে আছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম
মোহাম্মদ ইব্রাহিম , চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
বন্যার পানি নামতে শুরু হয়েছে । নদী-খাল তার স্বাভাবিক রূপে ফিরতে শুরু করেছে। ঘরবাড়ি থেকে সরে যাচ্ছে পানি। কিন্তু চট্টগ্রামের গ্রামীণ জনপদে মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। কারণ, যে সড়ক ধরে কৃষক মাঠে যান, শিক্ষার্থী স্কুলে যায়, রোগী হাসপাতালে পৌঁছান কিংবা ব্যবসায়ী পণ্য পরিবহন করেন, সেই সড়কের অনেকগুলোই এখন আর আগের অবস্থায় নেই। কোথাও রাস্তার মাঝখান ধসে গেছে, কোথাও পিচের নিচের মাটি স্রোতে ভেসে গেছে, আবার কোথাও ভেঙে পড়েছে সেতু ও কালভার্ট। ফলে পানি সরে যাওয়ার পরও থমকে আছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রাথমিক হিসাব বলছে, সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলার অন্তত ৫৮২টি গ্রামীণ সড়কের প্রায় ৩৯১ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ১৮০টি সেতু, কালভার্ট, স্লুইসগেট ও অন্যান্য অবকাঠামো বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার অন্তত ২৯টি স্থানে সড়ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। তবে অধিকাংশ এলাকাতেই এখনো স্বাভাবিক যোগাযোগ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
দক্ষিণ চট্টগ্রামেই সবচেয়ে বড় ক্ষতি
এলজিইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও লোহাগাড়া উপজেলা। বন্যার পানির তীব্র স্রোতে এসব এলাকার অনেক সড়কের নিচের মাটি ধুয়ে গেছে। কোথাও রাস্তার অর্ধেক অংশ খালের মধ্যে বিলীন হয়েছে, কোথাও সড়ক ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে।
সাতকানিয়ায় ৪০টি সড়কের প্রায় ২৫ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি সড়ক এখনো যান চলাচলের অনুপযোগী। অন্যদিকে বাঁশখালীতে ৬০টি সড়কের প্রায় ১১০ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ইউনিয়নে ট্রাক, পিকআপ কিংবা অ্যাম্বুলেন্স চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়নেও একই চিত্র। কোথাও কালভার্ট ভেঙে পড়েছে, কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁশের সাঁকো বানিয়ে চলাচল করছেন। অনেক স্থানে মোটরসাইকেল পর্যন্ত চলতে পারছে না।
ক্ষতি শুধু সড়কের নয়, অর্থনীতিরও
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর বেশির ভাগই ইউনিয়ন ও গ্রামের সংযোগ সড়ক। এগুলো সচল না থাকায় কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সবজি, ধান, দুধ, মাছসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় দুটিই বেড়েছে।
শুধু কৃষি নয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নিতে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে না পারায় বিকল্পভাবে খাটিয়া কিংবা ছোট নৌকার সহায়তা নিতে হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভাঙা সড়কের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দামও বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।
প্রতি বছর একই চিত্র, প্রশ্ন পরিকল্পনা নিয়ে
বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে প্রায় একই স্থানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্ষা শেষে অস্থায়ীভাবে মাটি ফেলে কিংবা ইট বিছিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা করা হলেও পরের বর্ষায় আবারও সেই সড়ক ভেঙে যায়।
প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কোথায়?
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক গ্রামীণ সড়ক এমন সময়ে নির্মিত হয়েছিল, যখন বর্তমানের মতো অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বা পাহাড়ি ঢলের চাপ ছিল না। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু সড়কের নকশা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা কিংবা কালভার্টের ধারণক্ষমতা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত করা হয়নি। ফলে পানির প্রবল চাপ সরাসরি সড়কের ভিত্তি ধ্বংস করছে।
শুধু সংস্কার নয়, প্রয়োজন নতুন পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে যান চলাচল চালু করাই এখন প্রথম লক্ষ্য। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন নতুন নকশায় সড়ক পুনর্নির্মাণ, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বড় আকারের কালভার্ট ও সেতু নির্মাণ।
এলজিইডি সূত্র জানায়, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। বিস্তারিত জরিপ শেষে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
জলবায়ুর নতুন বাস্তবতায় পুরোনো অবকাঠামো
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের প্রবণতা বেড়েছে। ফলে আগের নকশায় নির্মিত গ্রামীণ অবকাঠামো এখন আর পর্যাপ্ত নয়। কেবল ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করলেই ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমবে না। প্রয়োজন জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা।
জরুরি সংস্কার চলছে, কিন্তু ভোগান্তি কবে কমবে?
জেলার বিভিন্ন স্থানে জরুরি মেরামতকাজ চললেও অনেক এলাকায় এখনো বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। কোথাও কয়েক কিলোমিটার ঘুরে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে, কোথাও স্থানীয়রা নিজেরাই বাঁশ, বালুর বস্তা ও মাটি দিয়ে অস্থায়ী রাস্তা তৈরি করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বন্যার সময় কয়েক দিনের দুর্ভোগ ছিল। কিন্তু ভাঙা সড়কের কারণে সেই দুর্ভোগ হয়তো কয়েক মাস কিংবা তারও বেশি সময় ধরে চলবে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
চট্টগ্রামের গ্রামীণ সড়কগুলো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এগুলো একটি অঞ্চলের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণরেখা। তাই ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত পুনর্নির্মাণ না হলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও পড়বে।
বন্যার পানি নেমে গেছে, কিন্তু রেখে গেছে শত শত কিলোমিটার ভাঙা সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত সেতু এবং বিচ্ছিন্ন জনপদের দীর্ঘশ্বাস। এখন প্রশ্ন একটাই প্রতি বছর দুর্যোগের পর একই ক্ষতির হিসাব গুনবে চট্টগ্রাম, নাকি এবার টেকসই পরিকল্পনায় বদলাবে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।








