সীতাকুণ্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু: জাহাজভাঙা কারখানা গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ কাটার অভিযোগ
সূত্রঃ সংগৃহীত
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আজ শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—জাহাজটি কাটার আগে যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, জাহাজটি আগে এলএনজি বহন করত। এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে বিভিন্ন ট্যাংক ও অংশ সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন না করেই জাহাজ কাটার কাজ শুরু করা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল, সেটি এলএনজি বহন করত। জাহাজের কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস থাকতে পারে। তাঁর ভাষ্য, ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থাও দুর্বল ছিল।
সকালে হঠাৎ চিৎকার, এরপর একের পর এক লাশ
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, শুক্রবার সকালে কারখানার ভেতর থেকে হঠাৎ মানুষের চিৎকার শোনা যায়। পরে অসুস্থ কয়েকজন শ্রমিককে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
এরপর স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে কয়েকজন শ্রমিক পড়ে আছেন এবং তাঁদের কেউ কেউ মারা গেছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন কারখানার ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ইশতিয়াক রহমান জানান, ওই কারখানা থেকে দুই দফায় সাতজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে। একজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।
পরে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে আরও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭), মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)—এই চারজনের পরিচয় জানা গেছে। তাঁরা ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।
কারখানার বাইরেও ছড়িয়েছিল গ্যাসের গন্ধ
দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু কারখানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একজন বাসিন্দার ভাষ্য, সকালে কারখানার আশপাশে গ্যাসের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
ওই বাসিন্দা জানান, তাঁদের দুটি নৌকা সাগর থেকে ইলিশ ধরে উপকূলের দিকে ফিরছিল। কিন্তু কারখানার দিক থেকে আসা তীব্র গ্যাসের গন্ধের কারণে তাঁরা স্বাভাবিক পথে ফিরতে পারেননি। কারখানার পাশের খাল দিয়ে নৌকা প্রবেশ করানোও সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠছে, কারখানার ভেতরে গ্যাসের ঘনত্ব কতটা ছিল এবং দুর্ঘটনার পর আশপাশের মানুষকে ঝুঁকি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল কি না।
গ্যাসমুক্ত করার নিয়ম কতটা মানা হয়েছিল?
জাহাজভাঙা শিল্পে পুরোনো জাহাজ কাটার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো জাহাজের ভেতরে থাকা দাহ্য বা বিষাক্ত গ্যাস ও রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা। বিশেষ করে আগে এলএনজি বহনকারী জাহাজের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যে এই নিরাপত্তা প্রক্রিয়া নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। তাঁদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জাহাজের ট্যাংক যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কাজ করা হয়ে থাকতে পারে।
যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে জাহাজ কাটার আগে গ্যাস পরীক্ষা, ট্যাংক পরিষ্কার, নিরাপদ ঘোষণা এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া কতটা অনুসরণ করা হয়েছিল—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, কারখানায় কাজ শুরুর আগে গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করার কোনো যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল কি না এবং দুর্ঘটনার সময় জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল।
মালিকপক্ষের বক্তব্য
ফেরদৌস স্টিলের মালিকের প্রতিনিধি মো. মহিউদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, তিনি তখন কারখানার বাইরে ছিলেন। কারখানা থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, জাহাজে থাকা ছয় থেকে আটজন কর্মী অসতর্কতার কারণে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়েছেন। কারখানায় গিয়ে তিনি বিস্তারিত জানাবেন।
তবে মালিকপক্ষের এই বক্তব্যের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মালিকপক্ষ ঘটনাটিকে শ্রমিকদের অসতর্কতার সঙ্গে যুক্ত করলেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা বলেছেন, ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করে জাহাজ কাটার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন।
ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
৯ শ্রমিকের মৃত্যু যে প্রশ্ন সামনে আনল
সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা নতুন নয়। তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের নিরাপত্তা, জাহাজ কাটার আগে গ্যাসমুক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এবারের ঘটনাও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—একটি জাহাজে বিপজ্জনক গ্যাস থাকার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেটি কাটার আগে কী ধরনের নিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছিল?
জাহাজটি এলএনজি বহন করত—এ তথ্য কারখানা কর্তৃপক্ষের জানা থাকার পরও কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
জাহাজটি কীভাবে কারখানায় আনা হয়েছিল, সেটি গ্যাসমুক্ত করার সনদ ছিল কি না, গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, কারা পরীক্ষা করেছিলেন এবং কাজ শুরুর অনুমোদন কে দিয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে বেরিয়ে আসা জরুরি।
একই সঙ্গে নিহত শ্রমিকেরা কী ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করছিলেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ ছিল কি না এবং দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে কারখানার নিজস্ব ব্যবস্থা কতটা সক্রিয় ছিল—সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
কারখানা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, নাকি শ্রমিকদের অসতর্কতা—৯ শ্রমিকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে এখন নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এমকে/বিএম২৪









