রামেকে কমেছে হাম সন্দেহের রোগী, বাড়ছে ডেঙ্গুর চাপ
সূত্রঃ সংগৃহীত
ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী ব্যুরো
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তি রোগীর চাপ কিছুটা কমলেও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। গত আগস্ট মাসের প্রথম ১৫ দিনের তুলনায় শেষ ১৫ দিনে ডেঙ্গু রোগী প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন পাঁচজন।
রোগীর চাপ বাড়ায় ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত শয্যার তুলনায় প্রায় তিনগুণ রোগী বর্তমানে চিকিৎসাধীন। ফলে জায়গার সংকটে অনেক রোগীকে বারান্দা, মেঝে এবং দুই বেডের মাঝের ফাঁকা জায়গায় মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন একটি ওয়ার্ডের অংশকে ডেঙ্গু আইসোলেশন হিসেবে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
রামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ২৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে মাসের প্রথম ১৫ দিনে ভর্তি হন ৮৫ জন। পরবর্তী ১৫ দিনে ভর্তি হয়েছেন ১৫১ জন। অর্থাৎ মাসের দ্বিতীয়ার্ধে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা প্রথমার্ধের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
গত মাসে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ১৯৩ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালের ডেঙ্গু আইসোলেশনে ৪৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রামেক হাসপাতালের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত আইসোলেশনে মাত্র ১৬টি শয্যা রয়েছে। অথচ সেখানে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৪৭ জন। ফলে নির্ধারিত শয্যার বাইরে বারান্দা, মেঝে ও বেডের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গাতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের ডেঙ্গু আইসোলেশন ইউনিটে দেখা যায়, নির্ধারিত বেডের পাশাপাশি বারান্দা ও বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় মশারি টাঙিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগী ও স্বজনদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় ৩০ (এ) নম্বর ওয়ার্ডের একটি অংশকেও ডেঙ্গু আইসোলেশন হিসেবে চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এটি চালু হলে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মোট শয্যা সংখ্যা ৩৬টিতে উন্নীত হবে।
ডেঙ্গু আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন কয়েকজন রোগী ও তাঁদের স্বজন চিকিৎসাসেবা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, ওয়ার্ডে চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম এবং প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
এক রোগী বলেন, গাদাগাদি করে থাকার কারণে রোগীদের শারীরিক কষ্ট আরও বাড়ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সময়ে রোগীদের জন্য আলাদা নজর দেওয়া প্রয়োজন।
আরেক রোগী বলেন, দুই দিন ধরে ভর্তি থাকলেও পর্যাপ্ত শয্যা না পাওয়ায় মেঝেতে মশারি টাঙিয়ে থাকতে হচ্ছে। চিকিৎসার মান নিয়েও তিনি সন্তুষ্ট নন।
চুয়াডাঙ্গার ৭৫ বছর বয়সী ইউসুফ আলী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত সপ্তাহের মঙ্গলবার রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুটা সুস্থ হওয়ায় সোমবার তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে রাজশাহীতে এক আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার পর মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ছাড়া গত আগস্ট মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১০ আগস্ট ও ৩১ আগস্ট দুজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচজন বলে রামেকের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম মাহমুদ বলেন, সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। ডেঙ্গু সন্দেহে রোগীদের প্রথমে মেডিসিন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলে তাঁদের আইসোলেশনে নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের আইসোলেশনে ১৬টি শয্যা রয়েছে। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের একটি অংশকে ডেঙ্গু আইসোলেশন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি চালু হলে শয্যা সংকট অনেকটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, রামেক হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তি রোগীর চাপ কিছুটা কমেছে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে হাম সন্দেহে ৮৯ জন রোগী ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে ৭৯ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাম সন্দেহে ২৮ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া ১১ আগস্ট হাম সন্দেহে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে রামেক হাসপাতালের হাম ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, শিশুদের জন্য নির্ধারিত বেশির ভাগ শয্যাই ফাঁকা। কোনো কোনো শিশু অসুস্থ হয়ে শয্যায় কাতরাচ্ছে, আবার কেউ সুস্থতার পথে ফিরে বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে।
কুষ্টিয়া থেকে আট মাস বয়সী ছেলে রাকিব চিকিৎসার জন্য রামেকে নিয়ে আসা মোহাম্মদ রনি বলেন, কুষ্টিয়ায় পাঁচ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও শিশুটির অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে শনিবার রাজশাহীতে নিয়ে আসেন। এখানে চিকিৎসা ভালো হচ্ছে, তবে কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নার্সদের দক্ষতা নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, শিশুটিকে ক্যানোলা পরানোর সময় কয়েকবার চেষ্টা করতে হয়েছে, এতে শিশুটি অনেক কষ্ট পেয়েছে।
সব মিলিয়ে রামেকে হাম সন্দেহের রোগীর চাপ কমলেও ডেঙ্গুর দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু আইসোলেশনে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও রোগীদের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। নতুন আইসোলেশন ইউনিট চালুর পর পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।









