১০০ টাকার ঋণে ৩৩ টাকাই খেলাপি

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
১০০ টাকার ঋণে ৩৩ টাকাই খেলাপি

সূত্রঃ ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক


বিশেষ ছাড়, ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ফলে মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন খেলাপি।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। সহজ হিসাবে, ব্যাংক থেকে ১০০ টাকা ঋণ নেওয়া হলে তার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা এখন খেলাপি।


এর আগে চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে উঠেছে।


খেলাপি ঋণের এমন ঊর্ধ্বগতিকে ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে দেশে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির প্রবণতা বেড়েছে। এতে ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।


তিনি বলেন, দীর্ঘদিন প্রকৃত খেলাপি ঋণ আড়াল করা হয়েছে। সব ব্যাংকের প্রকৃত তথ্য সামনে এলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তাই বিশেষ ছাড়ের পরিবর্তে ব্যাংক খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত আদায়যোগ্য ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।


বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ কমানো ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এটি কমানো না গেলে ব্যাংকিং খাতকে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন।


তিনি জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও বিশেষ এক্সিট পলিসির আওতায় ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সম্ভাবনাময় কিন্তু সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলোকে কাঠামোর মধ্যে এনে আদায়যোগ্য করা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনাই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য।


তবে এসব সুবিধার পরও খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুনে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৭ কোটি টাকা।


কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, অতীতে অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা অনেক ঋণ এখন নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কারণেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। বারবার নবায়ন করা হলেও আদায় না হওয়া ঋণগুলোও এখন শ্রেণিকৃত হচ্ছে।


ফলে দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসছে।