প্রশিক্ষণ শেষে খালি হাতে ফিরছেন না ২০ নারী, মিলছে সেলাই মেশিন
সূত্রঃ সংগৃহীত
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর হাতে সেলাই মেশিন না থাকায় শেখা দক্ষতা কাজে লাগাতে পারার অনিশ্চয়তায় ছিলেন চট্টগ্রামের ২০ নারী। তবে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে এবার তাঁদের সেই দুশ্চিন্তা কাটছে। প্রশিক্ষণ শেষে ২০ নারীর হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সোমবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কার্যালয়ের প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সেখানে প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানতে পারেন, প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের সেলাইয়ের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মেশিন দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই।
বিষয়টি জানার পরই উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক। প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকেই তিনি স্বপ্নীল ব্রাইট ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর আহ্বানে প্রতিষ্ঠানটি পাঁচটি সেলাই মেশিন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। পাশাপাশি আরও ১৫টি মেশিনের ব্যবস্থা করতে অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ফলে প্রশিক্ষণ শেষে খালি হাতে ফেরার আশঙ্কায় থাকা ২০ নারীর সামনে নিজেদের দক্ষতাকে আয়ে রূপ দেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা নাছরিন ফারজানা তিন সন্তানের মা। তাঁর স্বামী একসময় প্রবাসে থাকলেও বর্তমানে বেকার। সংসারে আর্থিক সংকটের মধ্যে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছেন তিনি।
নাছরিন বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে বিনা মূল্যে সেলাই মেশিন পাওয়ার সুযোগ হবে, তা তাঁরা ভাবেননি। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে মেশিন পাওয়ায় এখন ঘরে বসে কাজ করে সংসারের আর্থিক সংকট কিছুটা কমানোর আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের পর হাতে মেশিন না থাকলে অনেক নারীই শেখা কাজ ধরে রাখতে পারেন না। নিয়মিত চর্চার অভাবে একসময় অর্জিত দক্ষতাও হারিয়ে যায়।
প্রশিক্ষণের ফল যেন প্রশিক্ষণকক্ষেই আটকে না থাকে
ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কার্যক্রমের ২০২৫–২০২৭ চক্রের আওতায় আয়োজিত ‘প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ (টিওটি) কর্মসূচি উদ্বোধন করতে সোমবার সকালে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যান জেলা প্রশাসক।
এর আগে তিনি ‘জীবিকায়নের জন্য মহিলাদের দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি’র বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখেন। প্রশিক্ষণার্থীদের কাজ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের প্রশিক্ষণের অগ্রগতি, শেখা বিষয় এবং প্রশিক্ষণ শেষে অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান।
এ সময় আধুনিক দর্জিবিজ্ঞান ও এমব্রয়ডারি ট্রেডে প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের সেলাই মেশিন দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। এরপরই বিষয়টি সমাধানে উদ্যোগ নেন তিনি।
জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রশিক্ষণ শেষে একজন নারী সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বাস্তবে আয় করতে পারছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রতিটি কাজ গুরুত্বের সঙ্গে করার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রশিক্ষণার্থীরা অর্জিত দক্ষতা দিয়ে বাস্তবে টিকে থাকতে পারবেন কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জনগণ দেশের প্রধান সম্পদ। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা প্রশিক্ষকদের দায়িত্ব। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও যদি কেউ অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হতে না পারেন, তাহলে সেই প্রশিক্ষণের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
প্রশিক্ষণার্থীদের তিনি বলেন, কোনো কাজই ছোট নয়। প্রশিক্ষণে দেওয়া সময় ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে অর্জিত দক্ষতা যেন তাঁদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
পাঁচ ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ১০০ নারী
আয়োজকেরা জানান, পাঁচটি ট্রেডে ২০ জন করে মোট ১০০ নারী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। জেলা প্রশাসক প্রশিক্ষণের প্রতিটি ট্রেড ঘুরে দেখেন এবং কাজের মান উন্নয়নের পাশাপাশি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রশিক্ষণের লক্ষ্য শুধু সনদ বা একটি দক্ষতা অর্জন নয়; অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নারীদের আয় করার সুযোগ তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রশিক্ষণ শেষে কোথায় কাজ করবেন, কীভাবে পণ্য বাজারজাত করবেন এবং কীভাবে নিজ উদ্যোগে আয় শুরু করবেন—এসব বিষয়েও আগাম পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক আতিয়া চৌধুরী।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে শরণ, স্বপ্নীল ব্রাইট ফাউন্ডেশন, বিভা, রিডো, ঠিকানা, স্পার, এসএসডি, পল্লী সেবা সংস্থা, প্রদীপন ও এআরপি।
২০ নারীর জন্য সেলাই মেশিনের এই উদ্যোগ শুধু একটি উপকরণ পাওয়ার ঘটনা নয়; বরং প্রশিক্ষণে অর্জিত দক্ষতাকে বাস্তব আয়ে পরিণত করার একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
এমকে/বিএম২৪









