গুম মামলার আসামি ওসি অসিত, ক্ষমতার অপব্যবহারের শেষ কোথায়?
সূত্রঃ সংগৃহীত
মোঃ আসাদুজ্জামান
বিশেষ প্রতিনিধি
সম্প্রতি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু থানার সাবেক ওসি (তদন্ত) অসিত কুমার রায় নানামুখী বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজড হন। গোপন সূত্রে জানা যায়, ক্লোজ হওয়ার পরও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তিনি হরিণাকুণ্ডু থানায় অবস্থান করে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের মাধ্যমে পূর্বে ঘটানো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের শেষ মুহূর্তের হিসাব-নিকাশ মেটাচ্ছেন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে তাকে অতীতের ন্যায় বিশেষ সহযোগিতা প্রদান করছে তারই অনুগত পুলিশ সদস্যদের একাংশ।
সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও অনলাইন জার্নালে ওসি অসিত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠলে তাকে হরিণাকুণ্ডু থানা থেকে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজ করা হয়। কিন্তু নামেমাত্র ক্লোজ হলেও অবৈধ পথে থেমে নেই তার অন্তহীন পদযাত্রা!
অভিযোগ উঠেছে, ক্লোজ হওয়ার সময় তিনি মামলার সাক্ষীতে ছিলেন। ফিরে এসে পুলিশ লাইন্সের হাজিরা খাতায় সই করেই ফিরেছেন হরিণাকুণ্ডু থানায়। নবাগত ওসি জুলফিকার আলীর কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার নামে অবস্থান করছেন থানাতেই।
গোপন সূত্রে জানা যায়, হরিণাকুণ্ডুর বিভিন্ন এলাকায় তিনি থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে চলমান বিভিন্ন সালিশি বাণিজ্যের অর্থ উত্তোলনে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করছেন তার অনুগত পুলিশ সদস্যদের। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে করছেন সেসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের হিসাব-নিকাশ।
ভুক্তভোগীরা জানান, ক্লোজ হওয়ার পর তিনি থানায় এসে বেপরোয়াভাবে কাজ করেছেন। তিনি রুমের দরজা বন্ধ করে তার অনুগত পুলিশ সদস্যদের দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। থানার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলে সব সত্য বেরিয়ে আসবে।
জানা যায়, ২০১৩ সালে তিনি কুমিল্লায় র্যাব-১১-তে থাকাকালে লাকসাম উপজেলা বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত আসামি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান গুম মামলার আসামি হয়েও তথ্য গোপন করে তিনি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু থানায় অবস্থান করছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গোপন সূত্রে আরও জানা যায়, ২০১৩ সালে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য (১৯৮৮-৯১) বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম হিরু এবং পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির পারভেজ গুমের ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি এই অসিত কুমার রায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর আনুমানিক রাত ৮টার দিকে কুমিল্লা-লাকসাম মহাসড়ক থেকে র্যাব-১১-এর হাতে গুমের শিকার হন সাইফুল ইসলাম হিরু এবং হুমায়ুন কবির পারভেজ। সে সময় র্যাব-১১-তে কর্মরত অসিত কুমার রায় (তৎকালীন র্যাব-১১-তে থাকা পুলিশের এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তা, পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে পুলিশ পরিদর্শক) ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়।
গুমের পর মামলা না নেওয়ার একপর্যায়ে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা গুমের ঘটনায় ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর পরিবারের পক্ষ থেকে লাকসাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। যার নম্বর-২৩। ২০১৪ সালে সেটি মামলায় রূপ নেয়। গুমের শিকার হুমায়ুন কবির পারভেজের পিতা রঙ্গু মিয়া বাদী হয়ে সেই মামলাটি দায়ের করেন। যার মামলা নম্বর- সিআর ২৪৭/১৪ ইং। মামলার আসামিরা হলেন—১. নারায়ণগঞ্জ সাত খুন মামলার আসামি লে. কর্নেল তারেক সাইদ (বরখাস্ত), সাবেক সিও র্যাব-১১; ২. মেজর সাহেদ রাজীব (সাবেক কোম্পানি কমান্ডার, র্যাব-১১, সিপিসি-২, শাকতলা, কুমিল্লা); ৩. ডিএডি শাহজাহান আলী (পরিচিতি নম্বর-৬০৯২, সিপিসি-২, র্যাব-১১); ৪. কাজী সুলতান আহমেদ (তৎকালীন এসআই, সিপিসি-২, র্যাব-১১) ও অসিত কুমার রায় (তৎকালীন এসআই, সিপিসি-২, র্যাব-১১)।
পরবর্তীতে পুত্রশোকে হতবিহ্বল রঙ্গু মিয়া মারা গেলে মামলাটির বাদী হন হুমায়ুন কবির পারভেজের ভাই ফারুক মিয়া।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কিংবা জাতীয় গুম কমিশনেও এ বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দায়ের করা হলেও আলোচিত এই মামলাটি আজ অবধি আলোর মুখ দেখেনি! বিগত সরকারের আমলে গুমের উৎস তদন্তে একের পর এক অবহেলা ও কালবিলম্বে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে নানাবিধ প্রশ্ন!
এ বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম হিরু এবং হুমায়ুন কবির পারভেজের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ এবং অনুযোগের যেন কোনো শেষ নেই! তাঁদের একটাই দাবি, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনার মুখোশ উন্মোচন করা হোক। তাঁরা কি আদৌ বেঁচে আছেন? নাকি তাঁদের সত্যিই মেরে ফেলা হয়েছে? কী ঘটেছিল তাঁদের ভাগ্যে?
স্বজন হারানোর শোকে হতবিহ্বল পরিবারের মনে শতকোটি প্রশ্ন!
একই সঙ্গে মামলার সঠিক তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে গুম পরিবারের সদস্যদের মনে।
এমকে/বিএম২৪








